বিশেষ কলাম

আব্দুল ওয়াহাব: মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহঃ এদেশের ইতিহাসে এক কালজয়ী নাম। এদেশের আপামর জনতাকে জীবনের শেষপ্রান্তে তাওবার ডাক দিয়ে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। একীভূত করতে পেরেছিলেন বহু মত-পথে বিভক্ত আলেম সমাজকে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ইসলামের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি দেখে তাঁর বৃদ্ধ শরীর আর্তনাদ করে উঠে। রাষ্ট্র,সমাজ,পরিবার ও ব্যক্তি সর্বক্ষেত্রেই ইসলাম যেন অচ্ছুত হতে চলেছিল।

কারণ নির্ণয়ে রত হলেন জাতির এই অশীতিপর বুজুর্গ। উদঘাটন করলেন বিপর্যয়ের মূল সূত্র। তিনি অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করলেন আরবী এক প্রবাদ “প্রত্যেক মানুষ তার শাসক দ্বারা প্রভাবিত ” এর বাস্তব রূপ। ভাবলেন তিনি এর উত্তরণের পথ। দেখলেন ক্ষমতার বাগডোর যাদের হাতে,তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মুসলমানদেরকে তাদের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান “আল কুরআন” অনুসারে পরিচালিত করছেনা। করতে দিচ্ছেনা। এই অবস্থা বরদাশত করতে পারলেননা তিনি। আধ্যাত্নিকতার পাশাপাশি ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত করলেন।

কিভাবে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন এই মহাপুরুষ? ভাবলেন তিনি। পর্যবেক্ষণ করলেন দেশের হালচাল। আন্তর্জাতিক মর্জি মেজায বিশ্লেষণ করলেন। বুঝতে পারলেন সাংগঠনিক সিস্টেম ছাড়া এপথে আগানোর কর্মী বাহিনী তৈরী সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন’। এবার ক্ষমতার দৃশ্যপটে ইসলামকে নিতে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে তিনি ঘোষণা করলেন-

“আমি খেলাফত আন্দোলনের মজলিসে শূরার ফায়সালা মোতাবেক জিহাদের অংশ হিসাবে এবং তওবার ক্ষেত্রে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহর উপর ভরসা করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেছি।”

আমীরে শরীয়ত হযরত মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে বক্তব্যে
সূত্র: হাফেজ্জী হুজুর রহ. রচনা সমগ্র, হাফেজ্জী হুজুর গবেষণা ফাউন্ডেশন, লালবাগ, ঢাকা, পৃ. ১২০।

(তথ্যসূত্রঃ চট্টলার ইতিহাসবিদ সগীর আহমাদ চৌধুরী)

অবশ্য ভোটের সংগ্রামে হাফেজ্জী হুজুরের অংশগ্রহণই কেবল আলেম সমাজের প্রথম কিছু এমনটা নয়। ব্রিটিশ পিরিয়ডে মুসলমানদের একক প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন মুসলীম লীগে বহু আলেম নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কিংবা মুসলমান নেতাদের সহযোগিতা করতেন। ব্রিটিশ পিরিয়ডের প্রথম দিকের দৃশ্যপটে আলেম সমাজ সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন,তখনকার পরিস্থিতিতে ওটাই যথার্থ ছিল। পরবর্তিতে পরিস্থিতির পরিবর্তনে আলেম সমাজও সংগ্রামের কৌশল পরিবর্তন করেন। তাইতো দেখা যায়, খেলাফত আন্দোলনের সংগ্রামে আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের সংগ্রাম সশস্ত্র ছিলনা। অথচ তাদের ডাকে পুরো ভারতবর্ষের মুসলমান একতাবদ্ধ হয়েছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গের বিশ্বাসঘাতকতায়ও মুসলমানরা সশস্ত্র সংগ্রামে যায়নি।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মুসলমানদের বহু আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে প্রত্যক্ষ ভোটকে নির্ধারণ করা হয়। আলেম সমাজও অংশ নেয় নির্দ্বিধায়।

পাকিস্তান আন্দোলনের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন বর্তমান বিশ্বের প্রাজ্ঞ আলেম আল্লামা ত্বাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহু এর পিতা হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.।

নির্বাচনী ভোট নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই লিখেন। এ সংক্রান্ত একটি পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন , ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি।
১. সাক্ষ্য প্রদান।
২. সুপারিশ।
৩. প্রতিনিধিত্বের অথরিটি প্রদান।

কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল সকলেরই জানা রয়েছে যে, শরীয়তে উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা তৈরির এবং রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য প্রতিনিধিত্বের সনদ দেওয়ার মানে হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব দানকারী (ভোটার) তার ভবিষ্যত সকল কার্যকলাপের দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিচ্ছে। এমনিভাবে সুপারিশের বিষয়টিও প্রনিধানযোগ্য। কুরআনুল কারীমের ভাষায় ‘যে ভালো সুপারিশ করবে সে তার নেকির ভাগিদার হবে। আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সেও মন্দের হিস্যা পাবে।’ -সূরা নিসা, আয়াত ৮৫

ভোট ও সাক্ষ্য
ভোটের মধ্যে যে তিনটি (সাক্ষ্য প্রদান, সুপারিশ, প্রতিনিধিত্বের সনদপ্রদান) বিষয় রয়েছে এর মধ্যে ‘শাহাদত’ বা সাক্ষ্যের বিষয়টি মৌলিক। অর্থাৎ কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ হল, তার ব্যাপারে এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, লোকটি ভালো এবং যোগ্য। এখন যদি যথাযথ জায়গায় সীল দিয়ে এ সাক্ষ্য প্রদান করা হয় তবে সে হবে সত্য সাক্ষ্য অন্যথায় হবে মিথ্যা সাক্ষ্য। আর মিথ্যা সাক্ষ্য যে কত বড় কবীরা গুনাহ ও হারাম কাজ তা কি কারো অজানা রয়েছে? অবশ্য বর্তমান বে-দ্বীনি ও বস্তবাদিতার যুগে অনেকের কাছেই মিথ্যা কোনো বিষয়ই নয়। কথায়, লিখায়, ক্ষমতায়, আদালতে, বই-মিডিয়ায়, বক্তৃতা-ভাষণে সব জায়গাতেই মিথ্যার সয়লাব। অথচ মানবতার মুক্তির দূত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠিন ভাষায় মিথ্যা ও মিথ্যা সাক্ষ্যের নিন্দা করেছেন।

সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় হযরত আবু বকর রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ একদা এক জায়গায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় তিন তিনবার সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে বড় কবীরা গুনাহের কথা বলব? সাহাবীগণ হ্যাঁ সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (এ দুটি কথা বলার পর তিনি সোজা হয়ে বসলেন) এবং বললেন, শুনে নাও! মিথ্যা সাক্ষ্য অনেক বড় কবীরা গুনাহ।

সুনানে তিরমিযীর একটি হাদীসে মিথ্যা সাক্ষ্যকে শিরকের সমান অপরাধ বলা হয়েছে। সু-বিখ্যাত হাদীস বিশারদ শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. মিথ্যা সাক্ষ্যকে চারটি বড় গুনাহের সমষ্টি বলে আখ্যা দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে : ১)নিজে মিথ্যা ও অপবাদ আরোপ করছে ২) যার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে তার উপর যুলুম করছে ৩) যার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছে তার উপরও প্রকৃতপক্ষে যুলুম করছে কারণ, সে যা কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিল না এ ব্যক্তি মিথ্যা সাক্ষ্যর মাধ্যমে তাকে এর অধিকারী করে তুলছে এবং এভাবে তাকে করছে জাহান্নামী ৪) মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার একটি হালাল কাজকে হারাম বানিয়ে নেওয়া।
মিথ্যা ও অবাস্তব সাক্ষ্যের ক্ষতি ও খেসারত বলে শেষ করার মতো নয়। হকদার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, অযোগ্য ও অপদার্থের উত্থান, দুর্নীতিবাজ ও শোষকশ্রেণীর লোকদের ক্ষমতায়ন- এসবই মিথ্যা সাক্ষ্যের ক্ষতি। এর কারণে ইনসাফপছন্দ এবং যোগ্য ও সৎ-আমানতদার ব্যক্তিগণ নিরবতা পালন করে রাষ্ট্র ও জনগণের খেদমত থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে বাধ্য হন।”

ভোট অবশ্যই দিতে হবে।
উপরোক্ত আলোচনা পড়ে প্রশ্ন আসতে পারে যে, তা হলে তো বর্তমান সমাজে অধিকাংশ আসনের লোকদের ভোট দেওয়াই সম্ভব হবে না। কারণ, এমন লোক তো পাওয়া যাবে না, যার স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করা যায় এবং এ কারণে অনেকে ভোট দেওয়া থেকে বিরতও থাকেন, এমনকি বহু লোক ভোটার হতেও আগ্রহী হন না। সাধারণ বিবেচনায় এ চিন্তা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এক্ষেত্রে কিন্তু মুদ্রার ভিন্ন পিঠও রয়েছে। তা হচ্ছে, মন্দের ভালো বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকে বেছে নেওয়া এবং অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। বর্তমানে ভোটকে এ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনায় আনতে হবে এবং ভোটের মাধ্যমে অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। কোনো আসনে একজন লোককেও যদি সাক্ষ্য ও ভোট দেওয়ার উপযুক্ত মনে না হয় তবে তাদের মধ্যে যে জন নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা ও কাজে-কর্মে অন্য প্রার্থীর তুলনায় কম খারাপ তাকেই ভোট দিতে হবে। কারো ব্যাপারে যদি খোদাদ্রোহিতা, ইসলাম-দুশমনী, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ-বিরোধী হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত থাকে তবে ঐ অসৎ ব্যক্তির বিজয় ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে।

মোটকথা, গণতন্ত্র ও বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির যতই ত্রুটি থাকুক এর কারণে ভোট দানে বিরত থাকা সমীচীন হবে না; বরং বুদ্ধি-বিবেচনা খরচ করে, ভেবে-চিন্তে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে ভাল-মন্দের ভালো অথবা অন্তত কম মন্দের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে শরীয়তের দৃষ্টিতে কাউকে ভোটদানের অর্থ হবে, এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, লোকটি তার প্রতিদ্বন্ধিদের তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো।

এদেশের যারা বর্তমানে ভোটকে হারাম বলে চিল্লাচ্ছে এদের প্রায় সকলকেই বিভিন্ন সময় দেখি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির তল্পিবাহক হতে। সুতরাং ডিগবাজিতে নেংটো হওয়া এসব কূপমণ্ডূক বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে আমরা বিশেষ চিন্তিত নই। বরং আফসোস লাগে তাগুতি শক্তির দাবার ঘুটি হতে দেখে। ইসলামী শক্তির যাত্রাপথে এদের বাধা হিসেবে দাঁড়ানো দেখে। এদের বুঝা উচিত,ইসলামী আন্দোলন কখনোই প্রচলিত পদ্ধতিকে নিজেদের চূড়ান্ত গন্তব্য ভাবেনা।

Facebook Comments