ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই স্বাধীনতার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে অভিনব ভোট ডাকাতির এই নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি অনতিবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পূণরায় নির্বাচনের দাবি করেন। পীর সাহেব বলেন, প্রহসনের নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করে অবিলম্বে দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দিতে হবে।

অন্যথায় ইসলামী আন্দোলন জনগণের নিরাপদ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তীব্র আন্দোলনের সূচনা করবে। আজ মঙ্গলবার বেলা ১২ টায় দলীয় কার্যলয়ে নির্বাচন উত্তর সংবাদ সম্মেলনে পীর সাহেব এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে পীর সাহেব বলেন, নির্বাচনটি ছিল শতভাগ নিয়ন্ত্রিত। নজির বিহীন কারচুপি, জালভোটের ছড়াছড়ি ও ভোট ডাকাতির কলঙ্কিত মহোৎসবের একটি মহড়া।

এরূপ পরিকল্পিত পাতানো নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্র, জনগণ ও প্রার্থীদের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করানোর প্রয়োজন ছিল না। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনের সকল বিভাগ সারাদেশের ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রে নৌকা ও মহাজোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য একযোগে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কথা বলে ভোট চুরি ও ডাকাতি করেছে। তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে নির্বাচনের আগের দিন রাতেই ভোট দেয়া সম্পন্ন করা হয়। ২৯ তারিখ প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও জিম্মি করে ব্যালট পেপারে সীল মারা হয়েছে।

দলের এজেন্টরা চ্যালেঞ্জ করলে প্রশাসন তা অস্বীকার করে। ভোটের দিন সকাল ১০টা নাগাদ প্রতিটি কেন্দ্রে সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনী প্রশাসনের সহায়তায় প্রকাশ্যে সীল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করেছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৩০ ডিসেম্বর ভোট শুরুর পূর্বেই ব্যালট বাক্স ভর্তি পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও দুপুরে বিরতির নামে দরজা বন্ধ করে সরকারদলীয় লোকজন কোমলমতি শিশু-কিশোরদের দিয়েও ব্যালট পেপারে ব্যাপকভাবে সীল পিটিয়েছে।

অধিকাংশ কেন্দ্র থেকে হাতপাখার এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ, রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, সহকারী মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, সহকারী মহাসচিব মো: আমিনুল ইসলাম, নগর দক্ষিণ সভাপতি মাওলানা ইমতিয়াজ আলম, নগর উত্তর সভাপতি মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ, ইঞ্জিনিয়র আশরাফুল আলম, কে.এম. আতিকুর রহমান, আলহাজ্ব আব্দুর রহমান, আলহাজ্ব আবুল কাশেম, মো: জান্নাতুল ইসলাম, এ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান, শহিদুল ইসলাম কবির, মো: সাইফুল ইসলাম, মো: হাসিবুল ইসলাম প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সারাদেশে সংগঠিত অনিয়মগুলো হচ্ছে; খুলনা-১ আসনে মোট ভোটারের চেয়ে ২২,৪১৯ ভোট বেশি পড়েছে (মানবজমিন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮)। বরিশাল-৫ আসনে মহিলাসহ ১২ হাতপাখার কর্মী মহাজোট কর্মীর হামলায় আহত হয়ে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন আছেন।

চাঁদপুর-১ আসনে প্রার্থী মাওলানা যোবায়ের আহমদের উপর হামলা করা হয়। তার গাড়ী ভাংচুর করে সহযোগীদেরও আহত করে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা। ঢাকা- ৪ আসনের প্রার্থী সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানীকে ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরী এলাকায় মহাজোটের কর্মীরা অবরুদ্ধ করে। ঢাকা- ১৩ আসনে (ইভিএম) ইলেক্ট্রনিক্স ভোট মেশিনে ভোট গ্রহণকৃত এলাকা সমূহের মধ্যে জাফরাবাদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় (৩৪ নং ওয়ার্ড), ব্লুমিং চাইল্ড স্কুল (৩৪ নং ওয়ার্ড), রায়ের বাজার কমিউনিটি সেন্টারসহ আরো অন্যান্য সেন্টারে লাইন থেকে বের করে দেয়া, ক্যাম্প ভেঙ্গে দেয়া, ভোটের মেশিন নষ্ট ও মেশিনে সমস্যা দেখিয়ে ভোটারদেরকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। নাটোর-১ আসনে ১ নং লালপুর ইউনিয়ন ৫ নং ওয়ার্ড বালিতিতা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার না দিয়ে ভোটারদের হাতে কালি দিয়ে ভোটের সুযোগ না দিয়েই বের করে দেওয়া হয়।

নোয়াখালী-২ আসনে ১০৩ কেন্দ্রের সকল কেন্দ্রেই সকাল ১১টার মধ্যে ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারা হয়। চাঁদপুর-৩ আসনে ৩ নং কল্যাণপুর ইউনিয়নে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় ৫ হাতপাখার কর্মী আহত হয়। ময়মনসিংহ-১০ আসনে সকাল ৯টার মধ্যে হাতপাখার সকল এজেন্টকে বের করে দিয়ে আওয়ামী এজেন্ট কর্তৃক নৌকায় সিল মেরে ব্যালটবাক্স ভর্তি করা হয়। সুনামগঞ্জ-১ আসনে বেলা ১২ টায় ব্যালট পেপার শেষ এবং বিভিন্ন আসনে নৌকা ও লাঙ্গলে জোরপূর্বক সিল মারা হয়। জয়পুরহাট-২ আসনে গোবিনাথপুর কেন্দ্র, গার্লস উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে জোরপূর্বক সিল মারা হয়। বগুড়া-৩ আসনে প্রার্থীর গাড়ী ইউএনওর সামনে পৌর মেয়র বেলালের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নিয়ে যায়। নোয়াখালী-২ আসনে ১০৩ কেন্দ্রের সকল কেন্দ্রেই সকাল ১১টার মধ্যে ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারা হয়। শেরপুর-১ আসনে সকল এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

রিটার্নিং অফিসার এ ব্যাপারে অভিযোগ গ্রহণ করেননি। ঢাকা-৬ আসনে দক্ষিণ মহসিন গার্লস স্কুল থেকে ইমরান নামে এক এজেন্টকে আটক করে ভোট শেষে ছেড়ে দেয়া হয়। ঢাকা-১৬ আসনে মিরপুর বাংলা স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে বোমা ফাটিয়ে কেন্দ্র দখল করা হয় এবং ভোটারদের প্রতি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে সহকারী রিটানিং অফিসার লিখিত অভিযোগ নিতে অস্বীকার। বগুড়া-৭ আসনে রামেরশাপুর, সোনারায় দক্ষিণপাড়া কানৈল, নেপালীতলাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ১২টার আগেই ব্যালট পেপার শেষ বলে জানানো হয়। দেশের অধিকাংশ আসনের একই চিত্র ছিল। পুলিশ র‌্যাব পাহারায় ভোটডাকতির মহোৎসব হয়েছে। যা দেশের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচনী ক্যাম্পে কর্মীদের মারধর করে ল্যাপটপসহ নির্বাচনী মালামাল ছিনিয়ে নেয় সরকার দলীয় লোকজন।

মাদারীপুর-৩ আসনের প্রার্থীকেই ভোট দিতে দেয়নি। তার ভোটও আগে দেয়া হয়ে গেছে। ঢাকা-২ আসনে প্রার্থী মাওলানা জহিরুল ইসলামসহ নেতাকর্মীদের উপর অতর্কিত হামলা চালান হয়। বি-বাড়িয়া-৩ আসনে সোনাসার প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট মাওলানা হাবিবুর রহমান নৌকা ও ধানের শীষের সমর্থকদের কেন্দ্র দখল নেয়ার সময় পুলিশের এলোপাতারী গুলিতে গুলি বিদ্ধ হয়। একই আসনের বীরপাশা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে হাতপাখার এজেন্ট মো: ফয়সাল মিয়াকে মারধর করে নৌকার সমর্থকরা ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয় এবং অধিকাংশ আসনে হাতপাখার এজেন্টদের ভুয়া মামলায় সম্পৃক্ত করে দেয়। ফেনী-৩ আসনে দাগনভূঁইয়া পৌরসভার ওয়াজিরিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশের সামনে টেনে-হিঁছড়ে কেন্দ্র থেকে বের রাস্তায় ফেলে ব্যাপক মারধর করে।

Facebook Comments