পলাশ রহমান, ইতালি থেকে: ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী প্রতীক হাতপাখা। দলটি এবারই প্রথম দেশের তিনশ আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করছে। ভোটের মাঠে তারা বেশ সরব। চোখে পড়ার মতো প্রচারণা করছে প্রতিদিন। অন্তত দু’ডজন হেভিওয়েট প্রার্থী আছে দলটিতে। এর মধ্যে বরিশাল-৫ আসনের প্রার্থী এবং ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীমের বিজয় অনেকটা নিশ্চত ধরেই এগুচ্ছে দলটি। বরিশালের সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচন যদি মোটামুটি ভাবেও সুষ্ঠু হয় তবে ফয়জুল করীমকে বড় দুই দল আটকাতে পারবে না। দেশি বিদেশি কয়েকটি ভোট জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা মনে করেন, ভোট সুষ্ঠু হলে কমপক্ষে অর্ধশত আসনে তাদের বিজয় নিশ্চিত। আরো অন্তত ৭০ থেকে ৮০টা আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা কড়া প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়ে তুলতে পারবে।

গত কয়েক বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলন একটি আলোচিত নাম। তারা কখনোই আওয়ামীলীগ-বিএনপির সাথে জোট করেনি। ক্ষমতাকেন্দ্রীক জোট রাজনীতির বিরুদ্ধে দলটির অবস্থান হলেও রাজনীতির চৌহার্দিতে তারা আওয়ামীলীগ ঘেঁষা বলে একটা গুনজন শোনা যায়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা কখনোই এতে বিভ্রান্ত হয়নি। বরং দলটি সমালোচকদের বড় একটা ধাক্কা দেয় ২০১৪ সালে। অন্য সকল বিরোধী দলের সাথে ইসলামী আন্দোলনও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একদলীয় নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু সমালোচকরা দমে যায়নি। তারা ধীরে ধীরে নতুন বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করে। গত পাঁচ বছরে যখন দেশের কোনো রাজনৈতিক দল রাস্তায় নামতে পারেনি তখনও ইসলামী আন্দোলন চোখে পড়ার মতো কর্মসূচি পালন করেছে। এ বিষয়ে দলের আমীর সৈয়দ রেজাউল করীম একবার বলেছিলেন, ইসলামী আন্দোলন আওয়ামীলীগের সাথে নেই, বিএনপির সাথেও নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিকভাবে ইসলামের স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম তৈরী করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেছিলেন, ইসলামী আন্দোলনের কাছে আওয়ামীলীগ বা বিএনপি আলাদা কিছু নয়। দুই দলই সুশাসন কায়েমে ব্যর্থ হয়েছে। তারা উভয়ই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব আদর্শিক ভাবে স্বীকার করে না। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।

রাজনীতি সচেতন মানুষরা ধারণা করেন, সরকার যদি ইসলামী আন্দোলনের উপর অত্যাচার করে তাহলে নিজেদের রক্ষা করার জন্যে হলেও তারা বিএনপি জোটে যোগ দিতে বাধ্য হবে। রাজনীতিতে চতুর আওয়ামীলীগ যা কোনো ভাবেই হতে দিতে চায় না। এ কারনে হয়তো সরকার ইসলামী আন্দোলনের প্রতি কিছুটা সহনশীল হতে পারে। সমালোচকরা উদ্দেশ্যপ্রণদিত ভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান সচেতন মহলে এখন স্পষ্ট। ইসলামী আন্দোলন ক্ষমতার মোহে ইসলাম আর অইসলামের মধ্যে ভুনা খিচুড়ি পাকিয়ে ভুরিভোজ করতে চায় না তা এখন সবাই বোঝে।

ভোটের মাঠে ইসলামী আন্দোলন ব্যাপক আলোচনায় থাকার অন্য একটি কারন হলো বিএনপি জোট মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, নৌকার বিজয় নিশ্চিত করার জন্যই হাতপাখা তিনশ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তাদের সরল সমীকরণ হলো- হাতপাখা না থাকলে ইসলামপন্থী ভোটগুলো বিএনপির প্রার্থী পেতো। কিন্তু এখন তা হবে না। ফলে বিএনপি প্রার্থীর নিশ্চিত বিজয় আওয়ামীলীগের ঘরে উঠবে। দলীয় কর্মীদের বোঝানোর জন্য বা সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য এই সরল সমীকরণ হয়তো ভোটের বাজারে চাটনির মতো বিক্রি হতে পারে, কিন্তু রাজনীতি সচেতন মানুষরা একটু অন্যভাবে চিন্তা করছে। সারা দেশে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের মতো ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও সরকারী হামলার শিকার হচ্ছে। খুলনা-৩ আসনের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর যুবলীগ হামলা করেছে। প্রার্থী মোজাম্মিল হকের ছেলেসহ বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হয়েছে। বরিশাল-৫ এ এক কর্মীর মাথা থেঁতলে দিয়েছে আওয়ামীলীগ। খুলনা-১ এ হাতপাখার পোষ্টারে আগুন দেয়া হয়েছে। গাজীপুরের গাজী আতাউর রহমানের প্রচার মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চাঁপাই-২ তে হুমকি দেয়া হয়েছে। পাহাড়ে চলছে ব্যাপক অপপ্রচার। নোয়াখালী-৪ এ এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হাতপাখার কর্মীদের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। এ ভাবে সারা দেশেই হাতপাখার প্রার্থী সমর্থকরা সরকারী হামলার শিকার হচ্ছেন। যা শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, সচেতন সব মহলেই আলোচিত হচ্ছে।

বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা মানুষকে তাদের সরল সমীকরণ গেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হলো- ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কথা যদি সত্যি হয়, তবে তারা কেনো অন্য কাউকে মাঠে নামাতে পারলেন না? আওয়ামীলীগ যদি বিএনপির ভোট ভাগ করতে হাতপাখা মাঠে নামাতে পারে, বিএনপি কেনো নৌকার ভোট ভাগ করতে অন্য কাউকে নামাতে পারলো না? রাজনীতিতে নিজের ব্যর্থতা অন্যের কাঁধে তুলে দেয়ার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি গোটা দুনিয়ায় চালু আছে। সুতরাং নতুন প্রজন্ম এসব সস্তা কথায় বিভ্রান্ত হয় না, এটা বুঝতে হয়তো আমাদের রাজনীতিকদের আরো কিছু দিন সময় লেগে যাবে।

ইসলামী ইসলামী আন্দোলনের নীতিনির্ধারকদের অন্যতম অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন একবার বলেছিলেন, একটা সময় আসবে যখন আওয়ামীলীগ বিএনপি একসাথে ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীতা করবে। একাদশ নির্বাচন থেকেই হয়তো এর আলামত শুরু হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের নিয়ে বড় দুই দলের মাথা ব্যাথা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, হাতপাখা এবারের নির্বাচনে সত্যিই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। আওয়ামীলীগ বিএনপির ধারাবাহিক দুশাসনের বিপক্ষে ইসলামী আন্দোলন দেশের গণমানুষের রাজনৈতিক ঠিকানা হয়ে উঠছে।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Facebook Comments