| |

সেক্যুলারিজম কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ?

প্রকাশিতঃ ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ | মে ২৭, ২০১৭

নুরুল করীম আকরাম : “সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরেপেক্ষতা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা”। সত্যিই কি তাই? আসুন একটু পেছন ফিরে দেখা যাক, কোন চেতনার উপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, জন্ম নিয়েছিল আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।

প্রথমেই তাকাই ছয়দফা দাবির দিকে যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মুলভিত্তি। মূলত এই দাবি আদায়ের সংগ্রামই রুপ নেয় স্বাধীনতা সংগ্রামে। অথচ এই ছয় দফার এক দফাতেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেক্যুলারিজমের বা ধর্মনিরেপেক্ষতার বিন্দুমাত্র উল্লেখও ছিলো না। [দেখুন – বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা : ২৬৭-২৭৩]

এবারে দেখুন উনসত্তর সালে সংগ্রামী ছাত্রসমাজের উত্থাপিত এগারো দফা দাবী। এ এগারো দফারও কোথাও সেক্যুলারিজমের কোন উল্লেখ ছিলো না। [দেখুন – বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা : ৪০৯-৪১২]

সত্তরের নির্বাচনী প্রচারে বঙ্গবন্ধুর যত বক্তৃতা বিবৃতি, কোথাও ধর্মনিরপেক্ষতার কোন কথা পাওয়া যায় না। বরং এসময় তিনি ইসলামের কথাই জোর দিয়ে বলেছেন। যেমন, পঁচিশে অক্টোবর ১৯৭০ এ রংপুরের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন “ছয় দফা কর্মসূচী পাকিস্তান বা ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, বরং তা বৈষম্যের বিরুদ্ধে”। [দেখুনঃ Bangladesh Documents, Volume I, page- 102, 103]

হ্যাঁ লক্ষ করুন, এই লড়াই ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের প্রতিষ্ঠা।

আরও দেখা যাক, সত্তুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কি ছিলো? ইশতেহারে বলা হয়েছিলো, “সংখ্যাগুরু জনগণ ইসলামে গভীরভাবে বিশ্বাস করে। সুতরাং পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন কোন আইন কিংবা বিধান আওয়ামী লীগ প্রবর্তন করবে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা সাংবিধানিকভাবে অক্ষুণ্ণ থাকবে”। [দেখুনঃ Bangladesh Documents, page- 67, 68]

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের সাতই ডিসেম্বর।

নির্বাচনে বিজয়ের পর জানুয়ারীর তিন তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় মহাসমাবেশ। এ সমাবেশের শুরু হয় সুরা ফাতেহা পাঠের মাধ্যমে এবং বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য শেষ করেন “নারায়ে তাকবীর” ধ্বনি দিয়ে। [দেখুনঃ Bangladesh Documents, page-137]

আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের সমাবেশ ও বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত ভাষন। জানেন কি এই সমাবেষ শেষ করা হয়েছিলো সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করে? সুরা ফাতেহা কিংবা মোনাজাত, এসব কি সেকুলারিজমের সাথে খাপ খায়? আর নারায়ে তাকবির ?

যাক, এতো গেলো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের কথা। আসুন দেখি যুদ্ধের সময় কি হোল।

স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয় একাত্তরের দশই এপ্রিল। এ ঘোষণায় স্বাধীনতা সংগ্রামের যে নয়টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিলো, হ্যাঁ নয়টি কারণ, এই নয়টি কারনের কোথাও বলা হয়নি যে পাকিস্তান যেহেতু একটি ইসলামিক রিপাবলিক তাই সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরেপেক্ষতার জন্য আমরা যুদ্ধ করছি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যদি সেক্যুলারিজমের বিন্দুমাত্র ভূমিকা থাকতো, তাহলে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রে তার ন্যুনতম উল্লেখ অবশ্যই থাকত?

এই ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা। এখানে সেক্যুলারিজম কোথায়? [দেখুনঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড]

হ্যাঁ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এগুলোই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সেকুলারিজম নয়।

এগারই এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের কারণ ও উদ্দেশ্য বর্ননা করে এক বিবৃতি প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করা সে বিবৃতির কোথাও সেক্যুলারিজমের কোন কথা বলা হয়নি।

এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখ বাংলাদেশের জনগণের জন্য নবগঠিত সরকার এক নির্দেশাবলী প্রকাশ করে। তার শুরুতেই লেখা ছিলো ‘আল্লাহু আকবার’। এবং শেষে লেখা ছিলো, “এ সংগ্রাম আমাদের বাচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার উপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন। স্মরণ করুনঃ আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ সুখকর’। বিশ্বাস রাখুনঃ ‘আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী’। [দেখুনঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড]

মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার শুরু করা হয়েছে আল্লাহু আকবর দিয়ে শেষ করা হয়েছে কুরআন শরীফের আয়াত দিয়ে। এটা কী সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার কোন নিদর্শন? নিশ্চয় না।

এখন প্রশ্ন হল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেক্যুলারিজম কোথা থেকে আসলো? যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কোন এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় পাল্টে যায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচী। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। নাটকীয়ভাবে হঠাৎ করেই এসবের পরিবর্তে জায়গা করে নেয় সমাজতন্ত্র এবং সেক্যুলারিজম।

কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও অফিস ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন।

18Shares