| |

বাই‘আত ও পীর-মুরীদী : ইসলাম কী বলে?

প্রকাশিতঃ ১:৩০ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ০৭, ২০১৮

মুফতি আবদুর রহমান গিলমান

বাই‘আত : বাই‘আত শব্দটি ‘বাইউন’ শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ হল ক্রয়-বিক্রয় করা। এক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয় এর অর্থ হচ্ছে, নিজেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট বিক্রি করে দেয়া এবং তার পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে জান্নাত খরিদ করে নেয়া। কুরআনে কারিমে সুরায়ে সফে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ক্রয়-বিক্রয়ের কথা এভাবে উল্লেখ করেছেন- ‘মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন বাণিজ্যের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন সম্পদ ও জীবনপণ করে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ।’ (সুরা সফ : ১০, ১১) পারিভাষিকভাবে বাই‘আত বলা হয়, শরীয়াতের কোন বিষয়ের ওপর মানুষদের থেকে অঙ্গিকার নেওয়া যে, ঐ কাজটি সম্পাদন করবে। এই অঙ্গিকার পূর্ণাঙ্গ শরীয়াতের ওপরও হতে পারে অথবা নির্দিষ্ট কোন মাসআলার ওপরও হতে পারে। -তাসাওউফ ওয়া সুলুক

বাই‘আত এর প্রকারভেদ : কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে কয়েক প্রকারের বাই‘আত পাওয়া যায়।

ইসলাম গ্রহণের বাই‘আত : কোনো অমুসলিম নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাই‘আত গ্রহণ করা। হিজরতের পূর্বে ‘বাই‘আতে আকাবা’ এই বাই‘আতেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

জিহাদের বাই‘আত : অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট আমিরের হাতে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী জিহাদ করার বাই‘আত গ্রহণ করা। যেমন: হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন হজরত উসমান রা.-এর শাহাদাতের সংবাদ আসল, তখন সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম হুজুর সা.-এর হাতে হজরত উসমান রা.-এর শাহাদাতের বদলা নেওয়ার জন্য বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন। সুরায়ে ফাতাহ-এর মধ্যে তা এভাবেই বর্ণিত হয়েছে- ‘যারা আপনার হাতে বাই‘আত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে, অতএব যে বাই‘আত ভঙ্গ করে; অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ করে আল্লাহ সত্ত্বরই তাকে মহাপুরষ্কার দান করবেন’। -সুরা ফাতাহ : ১০

খিলাফতের বাই‘আত : অর্থাৎ, ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফার হাতে তার আনুগত্যের বাই‘আত গ্রহণ করা।  যেমন: খোলাফায়ে রাশেদার প্রত্যেকের হাতে সাহাবায়ে কিরাম বাই‘আত গ্রহণ করেছিলেন।

আত্মশুদ্ধির জন্য শায়েখের হাতে বাই‘আত : এ বাই‘আতকে ‘বাই‘আতে তাওবাহ’ বা ‘বাই‘আতে তরিকত’ও বলা হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষের অন্তরের ভেতর যে রোগগুলো থাকে তা সংশোধন এবং আমলের উন্নতির জন্য একজন আল্লাহওয়ালার হাতে বাই‘আত গ্রহণ করা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে- ‘হে নবী! ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে বাই‘আত গ্রহণ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যাভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরশ থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, অত্যান্ত দয়ালু।’ (সুরা মুমতাহিনা : ১২)

এছাড়াও অসংখ্য হাদিস দ্বারা এ বাই‘আতের প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কিরাম অনেকেই বিভিন্ন সময়ে রাসুলের নিকট বিভিন্ন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য বাই‘আত গ্রহণ করেছেন।

বুখারী এবং মুসলিম শরিফে হজরত ওবাদা ইবনে সামেত রা. থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে সাহাবায়ে কিরামের একটি জামা‘আত বিভিন্ন গুনাহের কাজ না করার ওপর রাসুলের হাতে বাই‘আত হয়েছেন। অনুরূপভাবে মুসলিম শরিফে হজরত আওফ ইবনে মালেক আশজায়ী থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

জিহাদের ময়দানে অটল অবিচল থাকার জন্য বাই‘আত :  যদি কখনও এমন পরিস্থিতি হয় যে, জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তখন আমির সৈনিকদের থেকে জিহাদের ময়দানে দৃঢ় থাকার জন্য বাই‘আত নিবে।

বাই‘আতের পদ্ধতি : রাসুলে কারীম সা. থেকে হাতে হাত রেখে বাই‘আত করানো প্রমাণিত হয়। কুরআনের ভাষ্য দ্বারাও এটা স্পষ্ট হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর’। -সুরা ফাতাহ

কিন্তু কোথাও যদি অধিক সংখ্যক লোক বাই‘আত হতে আগ্রহী হয়, তখন সবার হাত ধরে বাই‘আত করানো অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এমন পরিস্থিতিতে কোনো কাপড়ের মাধ্যমে বাই‘আত করানো যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র কাপড়ের মাধ্যমেই বাই‘আত করানোকে সুন্নাত মনে করা বিদ‘আত হবে। আর মহিলাদের বাই‘আতের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই হাত ধরা যাবে না। হাদিসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সা. কখনও কোনো (বেগানা) মহিলার হাত স্পর্শ করেননি। তিনি মুখে মুখে মহিলাদের বাই‘আত করে নিতেন। বাই‘আত শেষে বলতেন, যাও, তোমাকে আমি বাই‘আত করে নিয়েছি।’ -বুখারী ও মুসলিম

কেউ কেউ বলেছেন, রাসুল সা. একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে হাত ভিজাতেন। পরে সেই পাত্র মহিলাদেরকে দিতেন। তখন মহিলারা তাতে হাত ভিজাতেন। এভাবে তিনি মহিলাদের বাই‘আত করাতেন। তবে এ বর্ণনাকে অনেকে দুর্বল বলেছেন।

পুরুষের জন্য নিয়ম হলো পীরের নিকট উপস্থিত থেকে বাই‘আত হবে। কিন্তু কোনো কারণে যদি উপস্থিত না থাকতে পারে তাহলে পত্র মারফত অথবা কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি মারফতও বাই‘আত হওয়া যাবে। এই বাই‘আতকে ‘বাই‘আতে উসমানী’ বলা হয়।

পীর : পীর শব্দটি ফার্সি। আরবিতে বলা হয় মুর্শিদ। আর মুর্শিদ অর্থ হল পথপ্রদর্শক। যিনি মানুষদেরকে আল্লাহর বিধি-বিধান পালন করার জন্য পথ প্রদর্শন করেন।

প্রয়োজনীয়তা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধানাবলী সাধারণত দুই প্রকার। প্রথমত বাহ্যিক বিধান। যেমন: নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত বাতেনী বিধান। যেমন: ইখলাস, সত্যবাদীতা, আল্লাহ পাকের মহাব্বত ইত্যাদি। বাহ্যিক বিধানগুলো পালন যেমন জরুরি, বাতেনী বিধানগুলো পালন তেমন জরুরি। এ বাতেনী বিধানগুলো পালন করাকে বলা হয় ইসলাহে নফস, তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি। সাধারণত যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার জন্য উস্তাদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দুনিয়ার যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হলে উস্তাদের শরণাপন্ন  হতে হয়। সে হিসেবে শরিয়তের বাহ্যিক বিধান হোক বাতেনী প্রয়োজনীয়তা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধানাবলী সাধারণত দুই প্রকার। প্রথমত বাহ্যিক বিধান। যেমন: নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত বাতেনী বিধান। যেমন: ইখলাস, সত্যবাদীতা, আল্লাহ পাকের মহাব্বত ইত্যাদি। বাহ্যিক বিধানগুলো পালন যেমন জরুরি, বাতেনী বিধানগুলো পালন তেমন জরুরি। এ বাতেনী বিধানগুলো পালন করাকে বলা হয় ইসলাহে নফস, তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি। সাধারণত যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার জন্য উস্তাদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দুনিয়ার যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হলে উস্তাদের শরণাপন্ন  হতে হয়। সে হিসেবে শরিয়তের বাহ্যিক বিধান হোক বাতেনী বিধান হোক তা শিক্ষা গ্রহণ করে ঐ অনুযায়ী আমল করার জন্য কোন না কোন উস্তাদের শরণাপন্ন হতে হবে। শরিয়তের ঐ বাতেনী বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং তদানুযায়ী আমল করার জন্য যে উস্তাদের নিকট গমন করা হয়, তাকেই পীর বা মুর্শিদ বলে। কুরআন এবং সুন্নাহর বিভিন্ন জায়গায় এ বাতেনী বিষয়গুলোর ওপর আমল করা এবং এর জন্য হক্কানী পীর-মাশায়েখদের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যেমন : সুরায়ে তাওবার ১১৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদার বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।’ মানুষ যত প্রকার অন্যায় কাজ করে, সকল প্রকার অন্যায় থেকে বিরত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকা। কারণ, আল্লাহর ভয় যদি অন্তরে থাকে তাহলে যে কোনো অন্যায় কাজ করতে গিয়ে সে এ কারণেই থমকে দাঁড়াবে যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দেখছে। এর জন্য আমাকে আল্লাহর তা‘আলার দরবারে জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই এই তাকওয়া বা খোদাভীতির মাধ্যমে সকল প্রকার অন্যায় থেকে বিরত থাকা সম্ভব। কিন্তু এই তাকওয়া কিভাবে অর্জন হবে তাও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাথে সাথে বলে দিয়েছেন যে, ‘তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও’। বস্তুত: হক্কানী পীরগণ সত্যবাদী হয়ে থাকেন এবং তাঁদের হাতে যারা বাই‘আত গ্রহণ করেন তাঁদের আল্লাহভীতির শিক্ষা দান করেন। তাইতো অনেক হক্কানী পীরের মুরীদদের দেখা যায়, তাঁদের মাঝে আল্লাহভীতি থাকার কারণে অনেক গুণাহ থেকে মুক্ত থাকেন।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পীর : কুরআনে কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘যাকে আল্লাহ হেদায়াত দেন, সে হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক রাখেন না।’(সুরা কাহাফ:১৭) এই আয়াতের দ্বারা বুঝা যায়, যাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হেদায়াত দিতে চান তার জন্য মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক এর ব্যবস্থা করে দেন। আর পীর দ্বারা সাধারণত যে অর্থ বুঝানো হয় তার আরবি শব্দ হলো মুর্শিদ।

সুরা লোকমানের ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- ‘তুমি ঐ ব্যক্তির পথ অনুসরণ কর যে আমার অভিমুখী হয়’। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে উসমানীতে বলা হয়েছে- ‘অর্থাৎ পয়গাম্বরগণ এবং নেক বান্দাদের পথে চল।’ তাফসিরে মাওয়াহিবুর রহমানে এই আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে বর্ণিত হয়েছে- ‘এবং তুমি এমন ব্যক্তির পথে চল যে সর্বদা আমার দিকে ঝুকে আছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য প্রথমতঃ নবীগণ, দ্বিতীয়তঃ আপনার নেক বান্দাগণ।’

সুরা মুমতাহিনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে বাই‘আত গ্রহণ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরশ থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, অত্যান্ত দয়ালু।’ (মুমতাহিনা : ১২)

অন্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথী হও।’ (সুরা তাওবা) এ আয়াতের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু মুসা আশ‘আরী রা. হতে বর্ণিত, হুজুর সা. বলেন, “পুন্যবান সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গী যথাক্রমে মেশক বহনকারী আর হাপরে ফুৎকার দানকারীর ন্যায়। মেশক বহনকারী হয়ত তোমাকে মেশক প্রদান করবে বা তার নিকট হতে তুমি ক্রয় করবে। তাও না হলে সুগন্ধি তুমি অবশ্যই পাবে। পক্ষান্তরে হাপরে ফুৎকারকারী হয়ত তোমার কাপড় জ্বালাবে, নতুবা দুর্গন্ধতো অবশ্যই পাবে। (বুখারী শরিফ : ২/৮৩০, হাদিস নং- ৫৫৩৪)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের সর্বোৎকৃষ্ট সঙ্গী সে, যাকে দেখলে আল্লাহ তা‘আলার কথা স্বরণ হয়; যার কথায় ইলম বৃদ্ধি পায়; যার কাজ-কর্ম তোমাদেরকে পরকালের কথা স্বরণ করিয়ে দেয়।” (আবদ ইবনে হুমাইদ, আবু ইয়ালা-ইতহাফুল খিয়ারা ৮/১৬৩) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মুনাভী রহ. বলেন, যে ব্যক্তির মধ্যে ঈমানী গুণাবলীর সমন্বয় ঘটে, ইসলামের আদব-শিষ্টাচার পূর্ণতা লাভ করে এবং যার অন্তর সৎচরিত্রে আলোকিত, যার অন্তঃকরণ ইহসানের চূড়ায় আরোহন করে, তিনি নির্মলতায় হন আয়নাতুল্য। মুমিনগণ তাঁর দিকে তাকালে তাঁর স্বচ্ছতায় নিজেদের দোষগুলো দেখতে পায়। ভেসে উঠে তাঁর সুন্দরতম চরিত্রে নিজেদের অশুভ কার্যকলাপসমূহ। (ফয়যুল কাদীর ৬/২৫১-২৫২) এছাড়াও এ বিষয়ের উপর কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়।

কিন্তু এখন যদি কেউ বলে, কুরআন-হাদিসে পীরের কোনো আলোচনা নেই, তাই তা মানা যাবে না। তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে চাই- কথা সত্য, কুরআনে যেভাবে নামাজ, রোজার আলোচনা নেই, তদ্রুপ পীরেরও আলোচনা নেই। তাই পীর বাদ দেওয়ার আগে নামাজ-রোজা  বাদ দিতে হবে। যভস্ত কথা হলো কুরআনে নামাজ-রোজা নেই, আছে সালাত, সাওম। ঠিক তেমনি পীর নেই, কিন্তু তার আরবি শব্দ মুর্শিদ, সাদিক, হাদি ইত্যাদি শব্দ বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই যারা এধরণের কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায় এর দ্বারা তাদের কা-জ্ঞানহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়।

সঠিক পীরের পরিচয় : হক্কানী পীর-মাশায়েখদের সংস্পর্শে এসে বহুলোক দীনের পথে আসছে। সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছে। এজন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ পীর-মাশায়েখদের প্রতি দুর্বল। তাদেরকে অত্যান্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখে। তাই এই দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে ইয়াহুদি-খ্রিস্টান চক্র তাদের পা চাটা কিছু মূর্খ মানুষকে পীর সাজিয়ে, তাদের মাধ্যমে কিছু অদ্ভুট ভ্রান্ত আকিদা প্রচার করে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান আকিদা ধ্বংস করার চক্রান্ত শুরু করেছে। তাই পীর গ্রহণ করতে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর কষ্টিপাথরে পরখ করে দেখতে হবে, যার হতে বাই‘আত হতে যাচ্ছি, তিনি সঠিক পীর কি না? বাজারে সাধারণ দশ টাকা বিশ টাকার সদাই কিনতে গিয়ে অনেক পরখ করা হয় তা সঠিক কি না? সেক্ষেত্রে যার  হাতে আমার ঈমান-আমল সংশোধন করবো তাকে অবশ্যই ভালভাবে পরখ করতে হবে যে, তার হাতে বাই‘আত হলে আমার ঈমান-আমল সংশোধন হবে না ধ্বংস হবে। হাকিমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানবী রহ. কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক পীরের কতগুলো আলামত বর্ণনা করেছেন। সঠিক পীর চেনার ক্ষেত্রে এই আলামতগুলো যথেষ্ট সহায়ক হবে।

০১। পীর তাফসির, হাদিস, ফিকাহ শাস্ত্রের অভিজ্ঞ আলেম হবেন। অন্ততপক্ষে মিশকাত শরিফ ও জালালাইন শরিফ বুঝে পড়েছেন এই পরিমাণ ইলম থাকা আবশ্যক।

০২। পীরের আমল-আকিদা শরিয়ত অনুযায়ী হতে হবে। তাঁর স্বভাব চরিত্র ও অন্যান্য গুণাবলী শরিয়ত যেমন চায় তেমনি হতে হবে।

০৩। পীরের মধ্যে কোন প্রকার লোভ (টাকা-পয়সা, সম্মান, যশ-খ্যাতি ইত্যাদি) থাকবে না এবং নিজেকে কামেল হওয়ার দাবি করবে না।

০৪। তিনি নিজে কোন কামেল ও সঠিক পীরের কাছ থেকে আত্মশুদ্ধি ও তরিকত অর্জন করে থাকবেন।

০৫। সমসাময়িক দীনদার আলেমগণ এবং খাঁটি সুন্নাত তরিকার পীর-মাশায়েখগণ তাকে ভাল বলে মনে করবেন।

০৬। দুনিয়াদার অপেক্ষা দীনদার লোকেরাই তাঁর প্রতি বেশি ভক্তি শ্রদ্ধা রাখে এমন হতে হবে।

০৭। তাঁর মুরীদদের অধিকাংশ এমন যে, তারা শরিয়তের পাবন্দি করে এবং দুনিয়ার লোভ-লালসা কম করে।

০৮। পীর মনোযোগ সহকারে মুরিদদের তা‘লিম-তারবিয়াত ও আত্মশুদ্ধি করেন, তাদের কোন দোষ-ত্রুটি দেখলে সংশোধন করে দেন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী স্বাধীন ছেড়ে দেন না।

০৯। তার সংস্পর্শে কিছু দিন থাকলে দুনিয়ার ভালবাসা কম ও আখিরাতের চিন্তা বেশি হতে থাকে।

১০। পীর নিজেও নিয়মিত জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। (অন্ততঃপক্ষে নিয়মিত জিকির-আজকার করার পরিপূর্ণ ইচ্ছা রাখেন) কেননা নিজে আমল না করলে তার তা‘লিম-তারবিয়াতে বরকত হবে না।

কোনো কোনো উলামায়ে কিরাম কামেল পীরের আলামত উল্লেখ করে বলেছেন- ‘যিনি ধোঁকার ঘর (দুনিয়া) থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন, চিরস্থায়ী ঘরের (বেহেশত) দিকে আগ্রহী থাকেন এবং মৃত্যুর পূর্বেই তার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন তিনি হলেন কামেল পীর।’

আল্লামা ইবনুল আরাবী রহ. কামেল পীরের তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। ১. তাঁর দীন বা আমল হবে আম্বিয়াদের মতো। ২. তাঁর চিকিৎসা হবে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো এবং ৩. তাঁর রাজনীতি হবে বাদশাহের মতো। -তাসাওউফ ওয়া সুলুক

মোটকথা একজন কামেল পীর আর সাধারণ মানুষের মাঝে বাহ্যিক দেহাবয়ব এক হলেও ভিতরগতভাবে তাদের মাঝে রয়েছে অনেক পার্থক্য। যেমন- মিষ্টি এবং লবনাক্ত পানি দেখতে এক হলেও স্বাদ ভিন্ন ভিন্ন। তাই  উল্লেখিত গুণগুলো যার মধ্যে আছে তিনি একজন কামেল বা সঠিক পীর। তার হাতে নির্দ্বিধায় বাই‘আত হওয়া যাবে। এই গুণাবলী থাকার পর তার কারামাত আছে কি না? তার কাশফ হয় কি না বা তিনি কারও মনের ভাব জানতে পারেন কি না? তাঁর দোয়া কবুল হয় কি না? তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন কি না ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখার প্রয়োজন নেই। কারণ, অলি বা খোদার প্রিয় বান্দা হওয়ার জন্য এসব বিষয় জরুরি নয়।

মুরীদ : মুরীদ শব্দটি ইরাদাহ থেকে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা করা। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোন সঠিক পীরের হাতে বাই‘আত গ্রহণ করে এই ইচ্ছা পোষণ করল যে, সে আল্লাহ তা‘আলার সকল প্রকার আদেশ নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করবে তাকে মুরীদ বলে। মুরীদ হওয়ার উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আসল উদ্দেশ্য আল্লাহকে পাওয়া। আর আল্লাহকে পাওয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। আল্লাহ তা‘আলাকে সন্তুষ্ট করার একমাত্র উপায়, আজীবন তাঁর যাবতীয় হুকুম পালন করা। মুরীদ হওয়ার সময় এ ধরনের উদ্দেশ্য অন্তরে থাকা ঠিক নয় যে, মুরীদ হলে আমার থেকে অনেক প্রকারের কারামত প্রকাশ পাবে, আমি যতই অন্যায় কাজ করি না কেন, পীর সাহেব আমাকে কিয়ামতের দিন পার করে নিবেন, পীর সাহেব এক নজরেই আমাকে কামেল বানিয়ে দিবেন। আমার কোন আমল বা পরিশ্রম করার প্রয়োজন হবে না অথবা আমার ভিতরে অনেক জযবা সৃষ্টি হবে, আমি অনেক চিল্লা-পাল্লা করবো ইত্যাদি নানা বেহুদা উদ্দেশ্য অন্তরে যেন না আসে।

মুরীদের করণীয় : ০১. শরীয়াতের খেলাফ না হলে পীরের সব কথা ভক্তি সহকারে পালন করতে হবে।

০২. অন্তরে এই বিশ্বাস রাখা যে, এই পীর থেকেই আমার আত্মশুদ্ধি অর্জন হবে, অন্যদিকে মন দিলে ফয়েয ও বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে, স্পষ্ট ধারণার অভাবে কিছু লোক পীর মুরীদী সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণায় পতিত হয়েছে এবং একে বিদ‘আত বা শরিয়তবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। অথচ সত্যিকারের পীর-মুরীদীর মাঝে শরিয়তের অনুস্বরণ-অনুকরণ ব্যতীত অন্য কিছুর সামান্যতম মিশ্রণ পর্যন্ত নেই।

লেখক : কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, ইসলামী যুব আন্দোলন

 

125Shares