| |

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর রাজনীতি

প্রকাশিতঃ ১২:১৭ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ০৪, ২০১৮

মুহাম্মদ জুবায়ের আহসান:

লেখাটা প্রলম্বিত নয় । এখানে রাজনীতি কি? রাজনীতির গুরুত্ব কি? ইসলামী রাজনীতি কাকে বলে? নির্বাচনের সংজ্ঞা প্রভৃতি গতানুগতিক কোন প্রশ্নের জবাব বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হবেনা ।

আলোচনা করবো চলমান বহুল আলোচিত একটি প্রশ্ন নিয়ে । সেটা হলো ,

*চরমোনাই পীর নির্বাচনে অংশ নিয়ে কি কুফরী করছেন?

* নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে এই রাজনীতি কে কি কুফরী রাজনীতি বলা যাবে?

প্রথমত,

আমি আলোচনা করবো প্রশ্নগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে। প্রশ্নটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এমনভাবে চোখে পরে, যা দেখলে মনে হবে স্বাধীনতার ৪৭ বছরের ইতিহাসে চরমোনাই পীর একাই বুঝি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। তাই বিভিন্ন মহলে প্রশ্নের বিষয়টা এমনই হয় যে, নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে চরমোনাই পীর কি কুফরী করছেন?

তাই আমি প্রশ্নটির সীমাবদ্ধতা ভাঙতে চাই ।বাংলাদেশে আহলে হক্ব ওলামাদের মধ্যে সুপরিচিত ও যুগশ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিদের মধ্যে যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের সংক্ষিপ্ত কিছু অবস্থান ফুটিয়ে তুলবো ।

আল্লামা হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর নির্বাচনে অংশগ্রহণঃ

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির দিকপাল ,মাওলানা মুহাম্মাদ উল্লাহ হাফেজ্জী রহ. সর্বপ্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ১৯৮১ সালে। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেখানে তিনি ১.৭৯% ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংগগ্রহণ করেন এবং দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে ৫.৬৯% ভোট লাভ করে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।

১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে একমাত্র “জামাত ইসলাম বাংলাদেশ” ছাড়া সকল ইসলামপন্থী আলেম ওলামা হাফেজ্জী হুজুর রহ. কে সমর্থন করেছিলেন এবং তার স্বপক্ষে জোড়ালো অবস্থান নিয়েছিলেন।

শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর নির্বাচনঃ

শাইখুল হাদীস রহ. ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুর রহ এর অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও খেলাফত আন্দোলনের ব্যানারে একাধিকবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ।

মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণঃ

দেশের ইসলামী রাজনীতি ও ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আমিনী রহ এক অনন্য নাম। এমনকি ২০০১ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তার নির্বাচনী এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া -২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আর বেশীরভাগ সময় এসব নির্বাচনে দেশের বিচ্ছিন্ন হাতেগোনা কয়েকজন ওলামায় কেরাম ছাড়া সকল ওলামায় কেরাম নির্বাচনে এসব ইসলামী দলগুলোর স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তাই হাফেজ্জী রহ থেকে শুরু করে এযাবত ইসলামের প্রয়োজনে লাখো ওলামায় কেরাম নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং ভোট প্রদান করেছেন।

শুধু চরমোনাই পীর কেন্দ্রিক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন আদও একটি সম্পূর্ণ প্রশ্ন নয়। বরং যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কুফরী আখ্যায়িত করেন, তারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সকল আহলে হক ওলামায় কেরামগণকেই পক্ষান্তরে কুফরী করেছে বলে অভিমত ব্যাক্ত করেছেন।

তাই তাদের নিকট আমার প্রশ্ন থাকলো, দেশের সিংহ ভাগ ওলামায়ে কেরামের নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও আপনারা যেহেতু কুফরী আখ্যায়িত করছেন, তাই বিষয়টা নিশ্চই আর চরমোনাই পীরের নির্বাচন করাতে সীমাবদ্ধ থাকলো না।

দ্বিতীয়ত,

নির্বাচনে অংশগ্রহণ যদি কুফরীই হয়, তবে গণতান্ত্রিক দেশের পুঁজিবাদী অর্থ ব্যাবস্থা মেনে নিয়ে লেনদেন কি কুফরী হবেনা?

গণতান্ত্রিক আক্বীদায় বিশ্বাসী সরকারের অনুগত লোকদের পরিচালিত সুদ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেন কি অবৈধ হবেনা?

যদি বলেন, সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন মানেই সুদ মেনে নেয়া নয়, যদি বলেন ড. ফজলে কবীরের সাক্ষরিত গণতান্ত্রিক দেশের টাকা ব্যবহার মানেই কুফরী গণতন্ত্র মেনে নেয়া নয়, তাহলে আমরাও তো বলতে পারি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ অর্থই তো এই নয় যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থাকে মেনে নিলাম বা বিশ্বাস করে নিলাম? তবুও যদি আপনাদের প্রশ্ন থাকে, তাহলে আমি বলবো-

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১(ক) ধারায়, “প্রত্যেক নাগরিকের যেকোন ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে” মর্মে দেশের সংবিধান আপনাকে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে ।

অর্থাৎ রাষ্ট্র স্বাধীনতা দিয়েছে বিধায় আমরা ধর্ম মানছি। রাষ্ট্র যেখানে স্বাধীনতা দেয়না সেখানে আমরা তো আল্লাহর হুকুম হওয়া সত্বেও তা মানতে পারিনা।যেমন,

(১) নামায আল্লাহর ফরজ হুকুম ,রাষ্ট্র অনুমতি দেয় তাই নামায আদায় করি, তবে ক্বিতাল ও আল্লাহ তালার ফরজ হুকুম, শুধুমাত্র নাফ নদীর ওপারে লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে জিহাদ করাটা ফরজ হলেও সরকার অনুমতি দেয়নি বিধায় জিহাদ রহিত।

(২) সাওম আল্লাহ তালার ফরজ হুকুম, সরকার অনুমতি দেয় তাই সাওম বা রোজা পালন করি। পর্দা আল্লাহ তালার ফরজ হুকুম ,সরকার অনুমতি দেয়না তাই পর্দা ঐচ্ছিক বিষয় এ বিষয়ে বাধ্য করা যাবেনা, বরং সরকার চাইলে কোন নারী বা পুরুষ বেপর্দা হতেও বাধ্য

(৩) বিতরের সালাত ওয়াজিব হুকুম ,সরকার নিষেধ করে নাই তাই আদায় করি, ক্ষেত্র বিশেষ বিয়ে ওয়াজিব হলেও সরকার ২৫ (ছেলে) ১৮ (মেয়ে) বয়স ব্যাতীত বিয়ে করা যাবেনা বলে দিয়েছে তাই আল্লাহর হুকুম রহিত।

মাত্র তিনটা উদহারণ দিলাম। এভাবে কয়েকশত উদাহরণ দেয়া যাবে, যেখানে আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে আমরা সরকারের তাবেদারী করছি ,প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষ ভাবে ।

সে হিসেবে, নামায, রোজা, পর্দা, জিহাদ আল্লাহর হুকুম হলেই আপনি মানতে পারছেন না যতক্ষণ না সরকার অনুমোদন না দেয়। তাহলে আপনার উচিত হবে এই গণতান্ত্রিক সরকারের ফরমান না মেনে অন্য ভুখন্ডে গিয়ে নামায পরা, অথবা গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে নামায হয়না এই ফতোয়া দিয়ে নামায ছেড়ে দেয়া।

আপনি বা আমি কোনটাই করছি না। কিন্তু নির্বাচন ইসলামের একটি জায়েজ প্রক্রিয়া হলেও শুধু মাত্র গণতান্ত্রিক সরকারের দোহাই দিয়ে সেটাকে কুফরী ঘোষণা দিচ্ছেন। তাহলে অন্যান্য হুকুমগুলো কি ভেবে দেখার বিষয় নয় ?

দেখানে বাংলাদেশ বর্ডারের বাইরে গিয়ে একফোটা জল খাওয়ার জন্যও সরকারের ভিসার মুখাপেক্ষী আপনি, সেখানে আপনিই আরেকজনকে কুফরী করার অপবাদ দিচ্ছেন !!

খুব আজিব একটা প্রশ্ন না??

তৃতীয়ত,

আমাদের সকলের বুঝতে হবে, বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ধর্মের প্রাধান্যকে প্রত্যাখ্যান করে, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনে বিশ্বাসী। সেখানে সৃষ্টি কর্তার আইনের কোন অস্বিত্ব নেই। এমাতবস্থায় এই আধুনিক রাষ্ট্রব্যাবস্থার কুফরী শাসনের অধীনে থেকেই আমাদের কাজ করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত 

(১) রাষ্ট্রব্যাবস্থার কোন আইন বা নির্দেশনা ঈমান পরিত্যাগে বাধ্য না করে

(২) ইসলামী খিলাফত/ইমারত প্রতিষ্ঠিত না হয় ।

আর সেজন্য আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যাবস্থার সাথে ইসলামের সাদৃশ্য যেথায়, সেসব স্থানে সরকারের আনুগত্য করা, এই চিন্তায় থেকে যে আমি সরকারের নয়, আল্লাহর আইনের আনুগত্য করছি এবং যেসব আইন কুফরী এবং ঈমান বিধ্বংসী সেসব আইনের মৌখিক বিরোধীতা করা ও এরপক্ষে জনমত গড়ে তোলা। জনবান্ধব আইন হিসেবে ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। এবং প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনের পর বিপ্লবের ডাক দেয়া। তথাপি, ইসলাম, দেশ ও মানবতা রক্ষায় জিহাদের হুকুম ওলামায় কেরামের কাছ থেকে জেনে নিয়ে আমল করা।

পরিশেষ,

নির্বাচন মূলত আদর্শ প্রচারের মাধ্যম। নির্বাচনকালীন সময়টাতে প্রত্যেক ঘরে ঘরে গিয়ে খেলাফতের দাওয়াত দেয়া সম্ভব হয় এবং সেটা শরিয়তের গন্ডির মধ্য থেকেই সম্ভব। মক্কার ওয়াকাস মেলা মুশরিকদের দ্বারা পরিচালিত হত এবং সেখানে নর্তকীরা অশ্লীল পোষাকে নাচ-গান ও করতো, এতকিছু জানার পরেও রাসূল (স) ওয়াকাস মেলায় যেতেন এবং সেখানে সকল গোত্রপতীদের একত্রিত হবার সুযোগ নিয়ে, শরিয়তের গন্ডির ভেতর থেকেই দাওয়াত প্রদান করতেন, তেমনিভাবে নির্বাচন কুফফার দের দ্বারা পরিচালিত হবার পরেও এই ময়দানে মানুষকে সকল আদর্শের লোকেরা একত্রিত হয়ে নিজ নিজ আদর্শের দাওয়াত দেয়, মানুষের এই নির্বাচনমুখীতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী খিলাফতের /শাসনব্যাবস্থার সুমহান দাওয়াত পৌছে দেবার সময় হচ্ছে নির্বাচন ।তাই চরমপন্থী কিছু বিচ্ছিন্ন আলেমদের কথায় পশ্চাৎপদ না হয়ে ,সমসাময়িক বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনদের নির্বাচনে গিয়ে আদর্শিক লড়াইয়ে অংগগ্রহণের পরামর্শ গ্রহণ করে, ইসলামী আন্দোলনকে বেগবাগ করাই যেন আমাদের সকলের উদ্দেশ্য হয়।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE