| |

ইসলামী আন্দোলনের দালাল সমাচার

প্রকাশিতঃ ৭:২৬ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ০৭, ২০১৮

islami andolan

যুবায়ের আহমাদ

দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সিটি নির্বাচনগুলোতে প্রায় ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। ক্রমবর্ধমান এ জনশক্তিকে আরেকটু দক্ষ করতে পারলে এ এক বিপুল সম্ভাবনা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলীয় নীতির ব্যাপারে আপোষহীন এ দলটি ভাঙ্গনের কবলেও পড়েনি। বিভিন্ন মহল প্রায়ই অভিযোগ করেন, ‘ইসলামী আন্দোলন সরকারের দালালি করে।‘ আসলে এ অভিযোগ কতটা সত্য?

সম্প্রতি (৫ অক্টোবর) দলটি জাতীয় মহামাবেশ করেছে। সমাবেশ থেকে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে দলটি। এ ১০ দফার কয়টি দফা সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের দাবির সঙ্গে মেলে? গুরুত্বপুর্ণ দফাগুলো হলো, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।’ প্রশ্ন হলো ২০ দলীয় জোট কি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না, নাকি দীর্ঘ দিন ধরে বিএনপি তার জোটের শরিকদের নিয়ে এসব দাবিতেই আন্দোলন করে আসছে? সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন, ইভিএম ব্যববহার না করা, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করণের দাবিসহ প্রায় সবগুলো দাবিই তো বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের দাবির সঙ্গে মিলে গেল। তাহলে কি ইসলামী আন্দোলন ও পীর সাহেব চরমোনাই ‘বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের দালাল’?

আসলে ইসলামী আন্দোলন মূলত কোনো দলেরই দালালি করে না বরং দলীয় নীতিতে অটল থেকে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি দেয়। কখনো সে কর্মসূচির দুএকটি অংশ বিএনপির সঙ্গে, কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যায়। কারো সঙ্গে দুএকটি দাবি মিলে গেলেই তাকে ওই দলের ‘দালাল’ বানিয়ে দেওয়া মূলত এক ধরণের মানসিক রোগ।

অনেকে একটি কারণে ইসলামী আন্দোলনকে আওয়ামী লীগের গোপন সম্পর্ক থাকার অভিযোগ করেন এ কারণে যে, ২০০১ সালের জোট সরকারের সঙ্গে ছিলেন না। একটি জোটের সঙ্গে না থাকলেই কি এর বিরোধীদের ‘দালাল’? যারা তখন জোট সরকারে গিয়েছিলেন তাদের চিন্তায় হয়তো তারা ভুল করেননি। ঠিক করেছেন। তাদের চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখি। কিন্তু একটি বিষয় চিন্তা করলে হতাশ হই। কী পেয়েছিলাম (আওয়ামী লীগ দিয়েছে, দিচ্ছে বলছি না। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে জোট সরকারের তুলনাও করছি না। এরা তৌহিদী জনতার ভোটে ক্ষমতায় যায়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আলেম-উলামা ও তৌহিদী জনতার ভোট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল। ফলে তাদের প্রতি এদেশের ইসলামপ্রিয় জনতার প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি)? ইসলামী ঐক্যজোট থেকে নাকি একজনকে মন্ত্রীত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঐক্যজোট ভাগ হওয়ায় আর তা দেওয়া হয়নি। আফসোস, এদেশে গণবিচ্ছিন্ন ইনু মেনন সাহেবরা মন্ত্রিত্বের স্বাদ নিলেন তখন যদি বিভক্ত ঐক্যজোটের দুজন নেতাকেই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হতো তাহলে কী ক্ষতি হয়ে যেত তাদের? ততকালীন অবিসংবাদিত ধর্মীয় নেতা শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) জেল খাটা ও ফতোয়া বিরোধী আন্দোলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাতজন শহীদ হওয়ার পর ততকালীন সরকারের প্রতি গণমানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল তার ফলেই তো জোট ক্ষমতায় এসেছিল। সে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)কে মন্ত্রিত্ব দিলে কী সমস্যা হয়ে যেত? মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.) কি মন্ত্রিত্বের যোগ্য ছিলেন না? ১ জনের স্থলে ২ জনকে মন্ত্রী করলে কী সমস্যা হতো? ফতোয়াবিরোধী হাইকোর্টের রায় কি বাতিল করা হয়েছিল সে আমলে?

সে আমলে একটি আলিয়া মাদরাসাও কি সরকারি হয়েছিল (উল্লেখ্য, এ সরকারের আমলেও হয়নি)? রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সুবিধা দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু আলিয়া ধারার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের কি অপরাধ ছিল সে সরকারের কাছে? তারা কি কিছু করেছিলেন ইবতাদায়ি শিক্ষকদের জন্য? আলিয়া মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করেছিলেন? কামিলকে মাস্টার্সের স্বীকৃতি প্রদান ছাড়া ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার জন্য খুব কিছু করেছিলেন এমন চোখে পড়ে না। তবুও যারা সে জোটে ছিলেন তারা হয়তো তাদের চিন্তা থেকে ইসলামের স্বার্থেই গিয়েছিলেন। শ্রদ্ধা রাখি তাদের প্রতি। কিন্তু যারা সে জোটে যাননি তাদের কেন আপনারা কথায় কথায় ‘দালাল’ বলবেন?

ইসলামী আন্দোলন কি সরকারের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখে সুবিধা নিচ্ছে? কী সুবিধা নিচ্ছে? ইসলামী আন্দোলন যদি সত্যি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সুবিধা নিতে চাইত তাহলে বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কয়েকজন এমপি হতে পারত। হতে পারত মন্ত্রীও। গণবিচ্ছিন্ন বামপন্থি দলগুলো আর তরিকত ফেডারেশনের মতো প্যাড সর্বস্ব দল যেখানে একাধিক এমপি হতে পেরেছে সেখানে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়েও অনেক বেশি (এককভাবে ৫ শতাংশেরও বেশি) ভোটের অধিকারী ইসলামী আন্দোলন কি পারত না ১০ জন এমপি নিয়ে সংসদে যেতে? গোপনে আতাত করে সুবিধা নিতে চাইলে তো পারত। বিএনপি-জামায়াত ও জোট যে নির্বাচন বর্জন করেছিল, ইসলামী আন্দোলনও তো সে নির্বাচন বর্জন করেছিল। তাহলে তো ইসলামী আন্দোলন ‘বিএনপি জোটের দালাল’ হওয়ার কথা! ‘দালাল’ শব্দটি আজ খুবই নির্যাতিত। কখনো ডা. জাকির নায়েককে কেউ ‘ইহুদি খ্রিস্টানের দালাল’ বানাচ্ছে, কখনো কেউ জামায়াতকে দালাল বানাচ্ছে আবার জামায়াত কিংবা ইসলামের জন্য মাঠে সরব অন্য কোনো দলের অতিউতসাহী কর্মীরা ইসলামী আন্দোলন বা চরমোনাই সমর্থকদের দালাল বানাচ্ছে। অথচ মতের কিছু ভিন্নতা থাকলেও সবার মূল দাবি প্রায় এক। কেউ ‘ইহুদিদের দালালি করছে’, ‘সরকারের দালালি করছে’ -এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ না থাকলে তাকে ‘দালাল’ বলার অনুমতি কি দেয় ইসলাম? রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে এমন দোষে দোষারোপ করবে যা থেকে সে মুক্ত, আল্লাহ তাকে ‘রাদগাতুল খাবাল’ নামক জাহান্নামের (পুঁজ, রক্ত ও মলমূত্রের) গর্তে বাসস্থান করে দেবেন, যতক্ষণ সে অপবাদ থেকে ফিরে না আসে (অপবাদের প্রমাণ দিতে না পারে)।’  (আবু দাউদ)।

বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর কর্মীদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা। ভিন্নমতের কেউ ভালো বললেও তাতে ভুল খোঁজা আর নিজেদের কেউ ভুল বললেও তা বৈধ করার মানসিকতা আমাদের মধ্যে প্রচুর। মনে হয় যেন একটি ইসলামী দল অন্য ইসলামী দলগুলোকে বাম দলগুলোর চেয়েও বড় শত্রু মনে করে। সামান্য মতের বিপরীত হলেই একে অন্যের ‘মুখোশ উন্মোচনে ব্যস্ত’। এ বিষয়ে উদারতা তৈরিতে সবগুলো ইসলামী দলে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া হতে পারে আত্মশুদ্ধির একটা অংশ। ইসলামী দলের কর্মীদের জন্য উদারতা শর্ত করা উচিত। ইসলামের সীমার মধ্যে আছেন এমন যে কারো মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রশিক্ষণ আজ জরুরি। অন্য দলের ভালো কাজটায়ও দোষ না খুজে তাকে ভালো বলার চর্চা যদি সবগুলো দল করে তবে ইসলামী রাজনীতির অঙ্গণে স্বস্তি ফিরবে। একজন আরেকজনের কাছাকাছি আসতে পারবে। সহজ হবে ঐক্যের পথ। আর যদি একজন আরেকজনের বিরুদ্ধ কারণে-অকারণে বিষোদগার করতেই থাকে তাহলে দূরত্ব ক্রমেই বাড়বে।

ইসলামী আন্দোলন জোট চায়। ২৮ সেপ্টেম্বর ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের এক অনুষ্ঠানে দলটির আমীর বলেন, ‘নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ইসলামী আন্দোলন কোনো রাজনীতি করবে না। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় কেউ আগ্রহী হলে তাদের সঙ্গেই জোট বা সমঝোতা হবে।’

বড় দুই দল যে দুটোই ইসলামের খুব ভালো বন্ধু না, তাদের সঙ্গে জোট করে তাদেরকে নিরাপদে ক্ষমতায় এনে দিয়ে বিভিন্ন সুবিধার জন্য তাদের কাছে করুণা প্রার্থী না হয়ে ইসলামী দলগুলোর আলাদা জোট চায় ইসলামী আন্দোলন। তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার নিরাপদ সিড়ি না হয়ে নিজেরা পৃথক জোটের চিন্তা আপনি না করতে পারেন, আপনার ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে; কিন্তু যিনি ইসলামপন্থিদের বিশাল ভোটব্যাংকের সফল ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র জোট বা স্বতন্ত্র শক্তির স্বপ্ন দেখেন তার প্রতি আপনার শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন। ছোটখাটো বিষয়গুলোতে ছাড় দিয়ে একে অন্যের কাছে এই এদেশের ইসলামের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর তাওফিক আল্লাহ আমাদের দান করুন!

লেখক : কলামিস্ট; যুগ্ম সম্পাদক, ডেইলি ইসলাম।

852Shares