| |

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও অনৈক্য সৃষ্টিকারী দলসমূহের পরিণতি

প্রকাশিতঃ ১০:৫৬ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ২৩, ২০১৮

শহিদুল ইসলাম কবির: ইসলামী দল সমূহের কার্যকর ঐক্য বরাবর সময়ের দাবী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে হিসেবে ৭ টি ইসলামী দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ইসলামী ঐক্যজোট এর ব্যানারে জামায়াত ব্যাতিত সকল ইসলামী দল মিলে একটি প্রতীকে এক আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন তথা বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইসলামী দল সমূহের মধ্যে ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, তার কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করবো এখানে।

১. ইসলামী ঐক্যজোটের ঐক্যকে মজবুত করতে তৎকালীন সময়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আমীর মাওঃ সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান পদে নিজে না থেকে শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ. কে ছেড়ে দিয়ে নিজে ভাইস চেয়ারম্যান‌ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ও শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ. নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে আমিনী সাহেব ইসলামী ঐক্যজোটের বাইরে থাকায় সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. নিজ উদ্যোগে আমিনী সাহেবকে ইসলামী ঐক্যজোটে অন্তর্ভুক্ত করে মজবুত ইসলামী ঐক্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যাতে প্রমাণ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যকামী একটি দল।

২. পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. ও আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ পবিত্র মক্কা নগরীতে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের ইসলামী দল সমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে তারা একটি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। সে অনুযায়ী তারা ‘সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ’ নামে একটি ফোরাম গঠন করেন। এই সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ দেশের সকল ইসলামী দল বিলুপ্ত করে একটি ইসলামী দলের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হতে সকলকে আহবান জানিয়ে ঢাকা, খুলনাসহ কয়েকটি এলাকাতে আলেম ওলামাদের আলোচনায় বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ আলোচনা করতে থাকেন। সর্বশেষে ঢাকার মুহাম্মদপুরের জামেয়া রহমানিয়া মাদরাসাতে সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের চুড়ান্ত এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রামের দারুল মা’আরিফ এর মহাপরিচালক আল্লামা সুলতান যওক নদভী বলেন, ঐ দিনের সভায় একমাত্র মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছেন, আপনারা যদি সকলে একমত হন যে সব দল ভেঙ্গে একটি ইসলামী দল হবে তবে, আমরা ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে বিলুপ্ত করে আপনাদের সিদ্ধান্ত মেনে নতুন ইসলামী দলের একজন কর্মী হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত আছি। আল্লামা সুলতান যওক নদভী বলেন, নিজের দল ভেঙ্গে কর্মী হয়ে কাজ করার সাহসী উচ্চারন আর কোনো দল বা ব্যক্তি করতে পারে নি। সকলেই বলেছেন, সকলে আমাদের দলে আসেন। কিন্ত কেউ নিজেদের দল বিলুপ্ত করবেন একথা বলতে সাহস পান নি। যা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. পেরেছেন। এখানেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যের পক্ষে তাদের অবস্থান প্রমাণ করেছে।

৩. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট গঠনের সময়ে ইসলামী ঐক্যজোটের সভার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, বিএনপি ইসলামী ঐক্যজোটের ৮ শর্ত মানলে ৪ দলীয় জোটে ইসলামী ঐক্যজোট যোগ দিবে, অন্যথায় নয়। জোটের এমন সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে না জানিয়ে রাতের আঁধারে ইসলামী ঐক্যজোটের ঐক্য নষ্ট করে ইসলামী ঐক্যজোট ৪ দলীয় জোটে অংশ নেয়। এ কারনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এর মজবুত ঐক্যের উদ্যোগ হোচট খায়। ইসলামের নামে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈধতা পায়। ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে ইসলামী ঐক্যজোট আজ ৬ খন্ডে বিভক্ত হয়েছে। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত খেলাফত মজলিস ৪/৫ ভাগে বিভক্ত হয়। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও ৪ ভাগে বিভক্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ২ ভাগে বিভক্ত হয়। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ২ ভাগে বিভক্ত হয়। ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের রাজনীতির কারনে ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙ্গে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে দূরে ঠেলে দেয়ার কারনে তাদের দলগুলোও‌ ভেঙ্গে খান খান হয়ে তাদের অনেকে ক্ষমতাসীন সেক্যুলার রাজনীতির ধারক বাহক আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্য চায় বলেই প্রথমে নিজেদের নীতি আদর্শকে মজবুত করে দলের ঐক্য ও সংহতি ধরে রেখেছে। এখানেও প্রমাণ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্য প্রয়াসী একটি ইসলামী দল।

৪. হাইকোর্ট কতৃক সকল ধরনের ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে অরাজনৈতিকভাবে গড়ে ওঠা ঈমানী আন্দোলন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটিতে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন থাকায় ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ইসলামী ঐক্যজোটের পরে ইসলামী আইন বাস্থবায়ন কমিটিকে ৪ দলীয় জোটে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা শুরু হলে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এ ঈমানী আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম থেকে দূরে সরে আসতে বাধ্য হয়। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কারো দুনিয়ার সার্থ সিদ্ধির জন্য নয় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে। ঐক্যের পক্ষে থাকলেও দলের নীতি আদর্শকে জলাঞ্জলী দিয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কারো সাথে কোনো জোটবদ্ধ হবে না। যে কারনে এখানেও ঐক্যের নামে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে ঐক্য করতে গিয়ে হোচট খেতে হয়।

৫. হেফাজতে ইসলাম এর আন্দোলন শুরুর সময়ে হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত ওলামা সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছিলেন, কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি না করে আসুন আমরা ইসলামপন্থীরা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলি। তখন বিএনপি জোট সঙ্গী একটি ইসলামী ভাঙ্গা দলের প্রধান পীর সাহেব চরমোনাইকে ইশারা ইঙ্গিতে আক্রমন করতে শুরু করে বৃহত্তর ঐক্য বিনষ্ট করে। হেফাজতে ইসলাম এর মতো সংগঠনকে জামায়াত বিএনপির সহযোগি হিসেবে তৈরী করা হয়। এখানেও ইসলামপন্থীদের বৃহত্তর ঐক্য হওয়ার আহবানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয় ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের লোভ কারীরা। ফলে ইসলামী ঐক্যের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়।

তৈরী হয় তিক্ততা, যা বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বড় অন্তরায়।

এখানেও ইসলামী ঐক্যের জন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর উদ্যোগকে‌ নস্যাৎ করে দেয়া হয়।

৬. এত কিছুর পরেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সে ধারাবাহিকতায় রাজধানীর শাপলা চত্তরে হেফজতে ইসলাম আয়োজিত মহাসমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর হাজার হাজার নেতা কর্মী নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (শায়খে চরমোনাই)।

কিন্তু ইসলামী রাজনীতির নামে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর ঐক্য বিরোধীরা অন্য সকলকে মঞ্চে উঠতে দিলেও মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম সাহেবকে মঞ্চে উঠতে দেয়নি। তাদের এই কাজও ইসলামী ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যে ঐক্যের বিষয়ে উদার ও আন্তরিক সে কথা আবারো প্রমাণিত। যারা নিজেদেরকে ক্ষমতার কাছাকাছি মনে করে তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চায় না। এরা ইসলামী ঐক্য বিরোধী।

গুটি কয়েক মানুষের স্বার্থে এই চক্রটি লাখো মানুষের মাথা বিক্রয় করতে চায়। তাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কোনো মতলববাজ চরিত্রহীন ক্ষমতালোভী দলের সাথে আর কখনো ঐক্য করে ইসলামী আন্দোলনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস হতে দিবে না।

এতো কিছুর পরেও যে বা যারা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কে ঐক্য বিরোধী বলবে বুঝতে হবে তারা জনগনকে বিভ্রান্ত করার জন্য এগুলো বলছে।

আর যিনি এসব জানেন না তাদের কথা বলা বা লেখার পূর্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলে লেখা, বলা ও ছবক দেয়ার চেষ্টা করতে অনুরোধ করছি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর সাথে সম্পৃক্ত নয় বা যিনি এ দলকে পছন্দ করেন না এমন লোকের কাছ থেকে মনগড়া কথা শুনে নিজকে বুদ্ধিজীবী সাজিয়ে উপদেশ দেয়া অনুচিত বলে মনে করি।

পরিশেষে যে সকল দল ঐক্যের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপরীত অবস্থানে থেকে সুযোগ বুঝে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে তাদের পূর্বের ভাঙ্গন রোগের দূর না হওয়া পর্যন্ত কোনোরকম নির্বাচনী জোট সুফল বয়ে আনবে না বরং নতুন করে আরো দ্বন্দ ও তিক্ততা সৃষ্টি হবে বলে মনে করি।

লেখক : কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী কৃষক-মজুর আন্দোলন।

 

27Shares