| |

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাস

প্রকাশিতঃ ২:০২ অপরাহ্ণ | মার্চ ১৪, ২০১৮

হাসিবুর রহমান : ১৯৮৭ সালের ঐতিহাসিক ১৩ই মার্চ। শুরু হয় এক মহা বিপ্লবের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের রাজনীতির তখনও বেহাল দশা। তখনকার কামড়াকামড়ি বর্তমানের দুই দলের মধ্যেই সিমাবদ্ধ ছিলো না। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিও তখন বেশ শক্তিশালী অবস্হানে। ১৯৭৯ এর নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করার পর দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কারনে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। আওয়ামীলীগ তখন প্রায় কোনঠাসা।

৭৫ পরবর্তী ক্ষত তখনও দগদগে আওয়ামীলীগের গায়ে। জামায়াত তখনও ৭১ এর গাদ্দারীর তিলক মুছে দাড়াতে পারেনি। জাতীয় পার্টি এই সুযোগটা নিয়ে ১৯৮৬ এর নির্বাচনে ৩০০ আসনের ১৫৩ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর পরই এরশাদ স্বৈর আচরণ শুরু করে দেয়। ওলামায়ে কেরাম দ্বিধাভিবক্ত অবস্হায় কুলহীন নদীতে সাতরে ফিরছে। মরহুম হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর অভাবটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলো ইসলামপ্রিয় প্রতিবাদী মানুষগুলো।

এই অস্থিতিশীল পর্যায়ে বিশিষ্ট মুফাসসিরে কুরআন দেলোয়ার হুসাইন সাঈদী সাহেব ১৯৮৭ সালের প্রথম দিকে ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপক একটা প্লাটফর্ম তৈরি করার লক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেন মাওলানা আঃ রহিম রহ. এবং ব্যারিষ্টার মাও. কুরবান আলী সাহেবের সাথে। তাদের দুজনার পরামর্শে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যোগাযোগ করা হলো মাও. আঃ আহাদ আল মাদানী সাহেব এবং মরহুম আঃ জাব্বার সাহেবের সাথে। এরপর অধ্যাপক আঃ কাদের সাহেবও এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। চরমোনাই হযরত পীর সাহেব মরহুম ফজলুল করীম রহ. তখনও এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেননি। তাদের সিদ্ধান্তক্রমে ১০ই জানুয়ারি’৮৭ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় এবং চট্টগ্রামে মিছিল আহবান করা হয়।

এতে আশাতিত জনসম্পৃক্ততা দেখা যায়। লক্ষ লক্ষ লোকের অংশগ্রহণে বিশাল মিছিল হয় ঢাকা এবং চট্টগ্রামে। এরপরেই মূলত বৃহত পরিকল্পনায় হাত দেন সাঈদী সাহেব সহ বাকিরা। সকলেই একযোগে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই আন্দোলনে চরমোনাই হযরত পীর সাহেব হুজুরের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি জরুরী। কারণ হ্বকের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর হচ্ছেন তিনি। সর্বপরী ইসলামী রাজনীতির এক গর্বিত সিলসিলা রয়েছে পীর সাহেব হুজুরের। অর্থাত্‍ হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহ. থেকে নিয়ে হাফেজ্জী হুজুর সহ মরহুম এছহাক সাহেব রহ. পর্যন্ত যুগে যুগে সকলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

এমনকি ফজলুল করীম রহ. এর পিতা এছহাক সাহেব রহ. নেজামে ইসলাম পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাই এমন একজন যুগশ্রেষ্ট মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া বৃহত্‍ পরিসরে যুগপৎ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অনেকটাই কল্পনাতিত। তাই সকলের সিদ্ধান্তক্রমে ব্যারিষ্টার কুরবান আলী সাহেব, মুখতার সাহেব এবং সাবেক মন্ত্রী জনাব এছহাক সাহেবকে আলোচনার জন্য পীর সাহেব হুজুরের কাছে উত্তরবঙ্গে পাঠানো হলো।

তারা পীর সাহেব হুজুরের সাথে আলোচনা করার পর হুজুর সরাসরি বলে দিলেন, আমাকে সামনে এগিয়ে দিয়ে আপনারা পিছনে চলে যাবেন এমন একটা আশংকা কাজ করছে আমার মধ্যে। তাই আগে সকলে সমন্বয় হন তারপর সিদ্ধান্ত করেন। এরপর হুজুরকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয় এবং সাঈদী সাহেব সহ আটজনের সমন্বইয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যেই বৈঠকে জযবা দেখিয়ে দেলোয়ার সাইদী সাহেব পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ করেন এই দল গঠন এবং আন্দোলনে পিছপা না হওয়ার!

এবং ঐ মজলিশেই দলের নাম ঠিক করা হয় ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ আর পরবর্তি মিটিংয়ে দলের গঠনতন্ত্র, কর্মপন্থা, দলের ঘোষণা প্রকাশের সিদ্ধান্তের তারিখও নির্ধারন করা হয়। সেই মিটিংয়ে দলের কুপন ছাপানো হয় সে কুপনে পীর সাহেব হুজুর এবং সাঈদী সাহেব সহ আরো কয়েকজনের স্বাক্ষর নেয়া হয় এবং ৩-ই মার্চ সাংবাদিক সম্মেলন করে দেশবাসীর সামনে এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের অভিপ্রায় প্রকাশ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এবং সাংবাদিকদের সামনে সাঈদী সাহেব দলের নাম ঘোষণা করবেন বলেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এভাবেই দেলোয়ার সাঈদী সাহেবের উদ্যেগ, আঃ রহিম সাহেবের প্রচেষ্টা, মাও. আঃ আহাদ আল মাদানী এবং বায়তুশ শরফের পীর সাহেব মাও. আঃ জাব্বার সাহেবের আগ্রহে, ব্যারিষ্টার কোরবান আলী সাহেব ও আঃ কাদের সাহেবের শ্রম-সাধনায়, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হ্বক সাহেব এবং মাও. আঃ গাফফার সাহেবের সহযোগীতা এবং চরমোনাই হযরত পীর সাহেব ফজলুল করীম রহঃ এর সম্মতিতে জন্ম নিলো ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ নামের দলটি। ১৯৮৭ সালের ৩ই মার্চ।

সারাদেশের কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষ অপেক্ষায় তখন একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের প্লাটফর্মের নাম ঘোষণার। অধির আগ্রহে সবাই অপেক্ষমান। এমন সময় বাতাসে খবর চাউড় হয়ে গেলো, প্রধান উদ্যোক্তা দেলোয়ার হুসাইন সাঈদী সাহেব দেশ ছেড়ে উধাও! প্রথমে কল্পীত খবর মনে হলেও ঠিকই জানা গেলো সাঈদী সাহেব জামায়াতের মদদে দেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেছেন। মরহুম পীর সাহেব হুজুরের কথাটাই সত্যি হলো! সাঈদী সাহেব ভুলে গেলেন তার কুরআন ছুঁয়ে শপথের কথাও! পরে দেখা গেলো তিনি এসে জামায়াতের রাজনীতির সাথে সক্রিয়! এবং জামায়াতের উপরের পর্যায়ের রোকন সদস্য!! যাক, সাঈদী সাহেবের ঐতিহাসিক গাদ্দারীর পর সবাই মিলে তত্ক্ষনাত সিদ্ধান্ত নিলেন সাংবাদিকদের সামনে কথা বলবেন চরমোনাই পীর সাহেব হুজুর।

সিদ্ধান্তক্রমে ৮৭ সালের ৩ই মার্চ ঢাকাস্থ মতিঝিলের ‘হোটেল শরীফ ইনে’ দলের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পীর সাহেব হুজুর। তখনই যাত্রা শুরু করলো মহাবিপ্লবের এই অগ্রযাত্রা… ৩ই মার্চ সংবাদ সম্মেলন থেকেই সকল নেতৃবৃন্দ ১৩ই মার্চ শাপলা চত্ত্বরে নতুন গঠিত ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ এর উদ্যেগে প্রথম কর্মসূচী এবং জনগণের সামনে দল প্রকাশের স্বার্থে সমাবেশ পরবর্তি এক শো-ডাউন মিছিল কর্মসূচীর ঘোষণা দেন। এটিই ছিলো এই দলটির প্রথম কর্মসূচী এবং প্রথম দিনেই রক্তের সুঘ্রাণ পাওয়া তাজা রক্ত বিলিয়ে মাধ্যমে দলকে কবুলিয়্যাতের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। ঐতিহাসিক ১৩ই মার্চ ১৯৮৭। উত্তাল ঢাকার রাজপথ। স্বৈরসাশকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জনস্রোত ধেয়ে চললো শাপলা চত্ত্বর অভিমূখে। ওদিকে এরশাদ সরকার তখন দিশেহারা প্রায়! আগের দিনই সমাবেশ মঞ্চ ভেঙ্গে ফেলেছিলো পুলিশ বাহীনি।

কিন্তু জনস্রোত এগিয়ে চলছিলো বীরদর্পে। ইসলামী অভ্যূত্থাণের আশংকায় সরকারী বাহীনি রুপ নিলো হিংস্র জানোয়ারের রুপে। বেধরক লাঠিচার্জ, টিয়ার শেলের ঝাঝালো ধোঁয়া, জলকামানে আগুন গরম পানি দিয়ে দলের পবিত্রতা তৈরি করে দিলো তারা। রক্তের প্রবাহীত ধারা দলের চলার পথ মসৃণ করে দিলো। আগামীতে সাহসী পদক্ষেপ নিতে প্রেরণা যোগালো এই রক্তস্রোত। দিশেহারা জনতা বায়তুল মোকাররমে আশ্রয় নিয়েও মুক্তি পায়নি। জুতা পায়ে বায়তুল মোকাররমে ঢুকে হাজার হাজার মুসুল্লীদের উপড় অত্যাচারের ষ্টিম রোলার চালিয়েছে সরকারী বাহিনী। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ফাইভ ষ্টার হোটেলে এসি’র বাতাসে বসে নির্লজ্জের মত এই দৃশ্য দেখছিলো এই দল গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা!!

এরপর হাজার হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হলো। জাতীয় মসজিদের ছাঁপ ছাঁপ রক্তের দাগ সাক্ষী হয়ে রইলো এই বিপ্লব অগ্রযাত্রার.. এরপর আর পেছন ফিরে তাঁকাতে হয়নি। মুনাফিকরা চিহ্নিত হয়ে গেলো। আল্লাহর ওলী এবং বুযুর্গদের দেখানো পথে চলতে থাকলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সংগঠনটি। প্রত্যেকটা ইসলামী গণজাগরণে যার ভূমিকা ছিলো তপ্ত মরুর বুকে পানির ফোয়ারার ন্যায়। যুগের পরিক্রমায় রচিত হলো গর্বিত কিছু অধ্যায়: কাদীয়ানী বিরোধী আন্দোলন, তসলীমা খেদাও আন্দোলন, মসজিদ রক্তার আন্দোলন, ফতোয়া বিরোধী রায় বিরোধী আন্দোলন, নাস্তিক বিরোধী আন্দোলন, কুফুরী শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন, কোরআন বিরোধী নারীনীতি বর্জন আন্দোলন, স্বৈরাচার সরকার সহ আওয়ামী বিরোধী আন্দোলন এসবই ছিলো ঐ গর্বিত অধ্যায়ের জ্বলজ্বলে পাতা।

রাজনীতির মাঠে মরহুম পীর সাহেব হুজুরের দীপ্ত ঘোষণা- ‘শুধু নেতা নয় নীতির পরিবর্তন চাই’ স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে বাংলাদেশের রাজনীতির ফলকে। ১৯৮৭ সালের ১৩ই মার্চ থেকে উত্তাল পথ পাড়ি দিয়ে কন্টকাকীর্ন মরু পেরিয়ে ২০০৮ সালের ২০ই নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ এর পরিবর্তে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক (নিবন্ধন নং-০৩৪) শান্তির প্রতিক “হাত পাখা” প্রতীক সিলেকশনে নিবন্ধিত হয় দলটি। যার একের অধিক সহযোগী সংগঠন রয়েছে বর্তমানে।

যথাক্রমে- ইসলামী শসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন, ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, ইসলামী আইনজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটিসহ আরো অনেক। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৪ জেলা এবং আরো বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক জেলা সহ সকল থানা এবং ইউনিউন পর্যায়ে কমিটি রয়েছে এই সংগঠনটির। প্রতিষ্ঠাকালীন আমীর ছিলেন আলহাজ্ব হযরত মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. (মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই) আর বর্তমান আমীর মুফতী সৈয়দ রেজাউল করীম সাহেব দা.বা. এবং নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম সাহেব দা.বা.।

সংগঠনটি আল্লাহর ফযলে নির্বাচনে বাংলাদেশের ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েক জায়গায় যাদের সমর্থীত চেয়ারম্যান এবং ইউ.পি সদস্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ ইসলামী হুকুমত কায়েমের জাগরণে সর্বাগ্রে এই সংগঠনটিকেই স্থান দিয়ে থাকেন আলহামদুলিল্লাহ। কন্টকাকীর্ন দুই যুগের দীর্ঘ পথে মুনাফিকদের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ এর সাথে কল্পনাতিতভাবে জন সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যুগশ্রেষ্ট হাজার হাজার ওলামায়ে হযরতদের সম্পৃক্ততা দলটির ভবিষ্যত পথ মসৃণ করছে অনেকাংশেই।

‘নো ইষ্ট নো ওয়েষ্ট ইসলাম ইজ দ্যা বেষ্ট’ শীর্ষক বর্তমান আমীর সাহেবের দীপ্ত ঘোষণা ইসলামী হুকুমতের স্বপ্ন দেখা কোটি কোটি জনতার বুকে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

1051Shares