| |

চরমোনাই: ইতিহাস ঐতিহ্য ও অবদান

প্রকাশিতঃ ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ১২, ২০১৮

এইচ এম আবু বকর: বিশ্বজুড়ে ইসলামের ফিকির ও আত্মশুদ্ধি কেন্দ্রিক যতগুলো মারকায বিদ্যমান, চরমোনাই মারকায তন্মধ্যে অন্যতম। বিশুদ্ধ ইলম ও ফিকরের সূতিকাগার ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারাকে শতভাগ ধারণ করে তাবলীগ, তালীম, তাযকিয়া ও জিহাদের প্রেরণা বাংলার জনপদে দায়ীত্বের সাথে পৌঁছে দিতে এই মারকাযের অবদান অনস্বীকার্য।

চরমোনাই একটি ইউনিয়নের নাম। এটা কিন্তু কোনো তরীকা বা সংগঠনের নাম নয়। ইতিহাসে এই নামের সূত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই জনপদটি একটি দ্বীপ বা চর। এককালে এই চরে এক বুজুর্গ বসবাস করতেন যিনি মোনাই দরবেশ নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। পরবর্তীতে তার নাম অনুকরণে এই দ্বীপ মোনাইর চর বা চরমোনাই নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এভাবে কোনো বুজুর্গ বা বিখ্যাত ব্যক্তির নামে জনপদের নামকরণ হওয়ার প্রচলন সমাজে ব্যপক আছে। কিন্তু চরমোনাইর হযরত পীর সাহেব পরিচালিত তরীকা বা মিশনগুলোর সমর্থক-কর্মীদের এভাবে বলা যে, আমি চরমোনাই করি- নিতান্তই ভুল। আবার এই নামটিকে বিকৃত বানানে লেখাটাও মূর্খতা। কারণ, সরকারি কাগজপত্রে নামটি ঐতিহাসিকভাবেই “চরমোনাই” লিখিত হচ্ছে।

যাইহোক, বরিশাল শহরের উত্তর পূর্বে কোণে কীর্তনখোলা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদে ভারত বিভক্তিরও আগে ১৯৩৩ সালে আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. কর্তৃক দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আত্মশুদ্ধির জোরদার মেহনত শুরু হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে এখানে এর আগে তার মাতামহ সৈয়দ আবদুল জাব্বার ওরফে আহসানুল্লাহ কাসেমীর রহ. আমল থেকেই খানকাহ ভিত্তিক মেহনত চলে আসছিলো। সৈয়দ আহসানুল্লাহ কাসেমী রহ. ছিলেন বিখ্যাত দেওবন্দী আলেম ও উজানীর হযরত কারী ইবরাহীম সাহেবের রহ. সর্বপ্রথম খলীফা। অবশ্য এই দরবারে দ্বীনী মাদরাসা ও বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি প্রতিষ্ঠা করে তালীম ও তাযকিয়ার একটি সুশৃঙ্খল ধারা কায়েম করার কারণে আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. কেই স্থপতি পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জীবনীকারগণ লিখেন আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. প্রথমে ইলমে যাহেরী অর্জনের পর চিশতিয়া ছাবেরিয়া তরীকার বিখ্যাত বুযূর্গ কুতুবুল আলম রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর রহ. এর খলীফা উজানীর হযরত কারী ইবরাহীম সাহেব রহ. এর কাছে আত্মশুদ্ধির বাইয়াত গ্রহণ করেন।

এবং রিয়াজত ও মুজাহাদার শীর্ষস্থানে উন্নীত হয়ে চিশতিয়া ছাবেরিয়া তরীকায় খেলাফত লাভ করেন। এরপরে তিনি নিজের এলাকায় ফিরে এসে খানকার মেহনত শুরু করেন এবং তরীকার এই মিশনকে ব্যপকভাবে প্রসারিত করার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করতে শুরু করেন। নদীপথে দূরদূরান্তে নৌকায় করে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটতেন। চোখের তপ্ত অশ্রু নদীর অশান্ত জলে একাকার করে দিয়ে উম্মাহর হেদায়াতের জন্য দোয়া করতেন। তিনি যেসকল জনপদে কদম রেখেছেন সেখানেই হেদায়াতের মশাল জ্বলে উঠেছে। বংশগতভাবে চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবগণ সৈয়দ খান্দানের লোক হিসেবেই নথিপত্রে স্বীকৃত হয়ে আসছেন। জনশ্রুতি আছে, আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. এর পূর্বপুরুষ সৈয়দ আলী আকবর ও সৈয়দ আলী আসগর নামে দুইভাই আব্বাসীয় খেলাফতের শেষদিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আগমন করেন। এরমধ্যে প্রথমোক্ত জন কীর্তনখোলা নদীর পূর্বপাড়ে চরমোনাইর নিকটবর্তী পশুরিকাঠী গ্রামে এবং অন্যজন বরিশাল শহরের পশ্চিমপাশে লাকুটিয়া গ্রামে অধিবাসন গ্রহণ করেন। বিয়ে-শাদী করেন এবং দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত হন।

পরবর্তীতে সৈয়দ আলী আকবরের প্রোপৌত্র মাওলানা সৈয়দ আমজাদ আলীর রহ. ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন হাদীয়ে যামান আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ.। সে হিসেবে আল্লামা সৈয়দ ইসহাকের রহ. বংশপরম্পরা হচ্ছে, সৈয়দ ইসহাক ইবনে সৈয়দ আমজাদ আলী ইবনে সৈয়দ ওমর আলী ইবনে সৈয়দ আকবর আলী বাগদাদী রহ.। অবশ্য এই খান্দানের সৈয়দ হওয়া সম্পর্কে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীমের রহ. উক্তি ছিলো “কাগজপত্রে আমাদের বংশকে সৈয়দ উল্লেখ করা হলেও কোনো সনদ বর্নিত না থাকায় আমরা আওলাদে রাসূল দাবী করি না। তবে সৈয়দ হবার সম্ভাবনা থাকার কারণে আমরা যাকাত-ফিতরা গ্রহণ করি না”। যাইহোক, এই মহান দাঈ খান্দান যে পূর্ব থেকেই দ্বীনী খেদমতের বিশাল ফিকির ও জযবা সমৃদ্ধ একথা ঐতিহ্যগতভাবে প্রমাণিত। এই খান্দানের প্রসিদ্ধ বুজুর্গ আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. এর হাতে চরমোনাইতে দ্বীনের এই মাকবুল মারকায প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ে অদ্যবদি শূরার সিদ্ধান্তানুযায়ী ধারানুক্রমে এই বংশের যোগ্য মনিষীদের মাধ্যমেই সুচারুরূপে পরিচালিত হচ্ছে এবং ক্রমবিকশিত হচ্ছে।

১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণকারী মহান সাধক আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. এই মারকায প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৩ সালে তার মৃত্যূর পূর্ব পর্যন্ত প্রধান মুরব্বী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে ১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহনকারী কিংবদন্তী মহাপুরুষ আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৬ সালের ২৫ নভেম্বর তার মৃত্যূর পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এবং বর্তমান আমীরুল মুজাহিদীন মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম (হাফিযাহুল্লাহ) তার পিতার ইন্তেকালের পর থেকে অদ্যবদি অত্যন্ত আমানতদারী ও বিচক্ষণতার সাথে খানকার সবগুলো মিশনের প্রধান মুরব্বীর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আসছেন। চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবগণ এবং এই খানকার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় দাওয়াতের অঙ্গনে বিশাল অবদানের কথা। এই তরীকার শায়খগণ শত দুঃখ কষ্ট ও বাধাবিপত্তি সহ্য করে নববি দাওয়াতের পবিত্র আমানত মানুষ দ্বারে দ্বারে যত্নের সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার কারণে লক্ষ লক্ষ আল্লাহ ভোলা মুসলমান এবং বিধর্মীরা আজ এই তরীকার বদৌলতে হেদায়াতের মহান নেয়ামত লাভে ধন্য হচ্ছে। উম্মাহর হেদায়াতের পূর্ণ দরদ এবং আল্লাহর খাওফ ও খাশিয়াত নিয়ে শায়খদের যবানে যে হৃদয়স্পর্শী বায়ানাত ঝঙ্কৃত হয় তার প্রতিটি বাক্যই উম্মাহর হেদায়াতের দীপ্ত আলোকবর্তিকা। দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবগণ যে কী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা আজ বিশ্বব্যাপী কাজের মাধ্যমেই প্রমাণিত।

ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, নেপাল সহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ আমেরিকার প্রায় রাষ্ট্রেই আজ এই তরীকার কাজে ব্যপক জনসম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসবই শায়খদের কষ্টসাধ্য মেহনতের ফসল। আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. বাড়িঘর ছেড়ে দূরদূরান্তে পদব্রজে এবং নৌকায় করে দাওয়াতের জন্য ছুটে যেতেন। অনেকদিনের জন্য সফরে বের হলে কখনো বা তার স্ত্রীকে ওই নৌকায় করেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এভাবেই নিজেকে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন দাওয়াতের জন্য। আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীমের রহ. দাওয়াতি জিন্দেগীও ছিলো কষ্টের। কখনো পায়ে হেঁটে আবার কখনো বাই সাইকেলে করে দূরদূরান্তে দাওয়াত নিয়ে ছুটেছেন। যুগের অগ্রগতির সাথে সাথে দাওয়াতের কাজ ব্যপক করবার জন্য মোটরগাড়িতে প্রয়োজনে হেলিকপ্টারে বা বিমানে সফর করলেও কখনো বিলাসিতায় আকৃষ্ট হননি। বর্তমান আমীরুল মুজাহিদীন এবং নায়েবে আমীরুল মুজাহিদীনও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গাড়িতে করেই সফর করেন। মাসের ২৭/২৮ দিনই বাড়িঘর বিবি বাচ্চা রেখে দাওয়াত নিয়ে ছুটে যান গ্রাম-শহরে। অথচ হালের কতিপয় দুনিয়াদার বক্তাদের বিলাসিতা দেখে মনে হয় বিমান হেলিকপ্টারের মহড়া করছেন যেন। চরমোনাই মারকাযের ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের মাধ্যমে একটা প্রতিষ্ঠিত গতানুগতিক ধারনার অপনোদন ঘটেছে যে, পীরগণ শুধু খানকাহ ভিত্তিক মেহনত করবেন আর জনসাধারণ তাদের কাছে এসে আত্মশুদ্ধি করবে।

বরং চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবগণ কর্মের মাধ্যমে দ্বীনের মর্জিকেই প্রমাণিত করেছেন যে, তাবলীগ, তালীম, তাযকিয়া, জিহাদ ও রাজনীতির সমস্ত শাখায় একজন প্রকৃত শায়খ ও দ্বীনী এদারার পূর্ণ সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। ওলামাদের ফিকরি জগতে এটা নিঃসন্দেহে বিরাট বৈপ্লবিক অবদান। একথা আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে, এদেশের মাজারপুজারী, বেদআতি ও অসৎ পীর-ফকিরদের সবচেয়ে বড় ভীতি হচ্ছে একজন পীর সাহেব চরমোনাই। যুগে যুগে চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবদের রয়েছে দেওয়ানবাগী, আটরশী, চন্দ্রপুরীসহ সমস্ত ভন্ড পীরদেরকে রুখে দাঁড়াবার ইতিহাস। এবং তাদের প্রতি হকের দাওয়াতও অব্যাহত রয়েছে। ভ্রান্ত জামাতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীমের রহ. ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ “জামাতে ইসলাম ইসলামী দল নয়” অদ্যবদি বহাল আছে। কিন্তু তারা আজো পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সৎসাহস দেখাতে পারেনি। সুতরাং এদেশের ভন্ড পীর ও বাতিল ফেরকাগুলোর আস্ফালন রোধে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে চরমোনাই মারকাযের। এই মারকাযের একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য হচ্ছে আলিয়া ও কওমিয়া নেসাবের দুটি দেশসেরা বৃহৎ প্রতিষ্ঠান একই এদারায় পরিচালিত হওয়া। গলাগলি ধরে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠান দুটো পরিচালিত হওয়া পীর সাহেব চরমোনাইর দূরদর্শিতা ও ঐক্যকামীতার দলীল।

আমার একজন গবেষক ওস্তাদ বলেছিলেন, বৃটিশরা যখন আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে পাঠদানের জন্য শাস্ত্রজ্ঞ কওমী ওলামাদেরকে আহ্বান করেছিল। সেই আমল থেকেই তারা যদি আলিয়া ধারার সাথে এভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন তবে আজ এই বিশাল মেরুকরণ হতো না। বরং ইংরেজদের এই কুটকৌশল নিজেদের বিরুদ্ধে চলে যেত। আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীমকে রহ. আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ যদি হায়াতে বাঁচিয়ে রাখেন এবং তাওফীক দেন তাহলে আমি চরমোনাইতে কলেজও প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মুসলমানের সন্তানেরা এই পরিবেশে থেকে যেন দ্বীন শিখতে পারে। আসলে শায়খের ছিলো মুজাদ্দিদের দৃষ্টি। ছিলো উন্নত চিন্তা, উদার মানসিকতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

চরমোনাই মারকাযের মুরব্বীগণ সবসময় বাংলাদেশকে গভীরভাবে ধারণ করেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চরমোনাই মারকাযের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. চরমোনাই মাদরাসার বেশ কয়েকটি কামরা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগার এবং লঙ্গরখানা হিসেবে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল এবং ক্যাপ্টেন আবদুল লতিফ হযরতের কাছে আসতেন এবং পরামর্শ নিতেন। চরমোনাই আলিয়া মাদরাসার সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল ও সৈয়দ ইসহাক রহ. এর জামাতা মাওলানা ইউসুফ আলী খান সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তার শশুরের ইচ্ছাতেই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চরমোনাই দরবারের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট। ধর্মীয় অনাচারের মত মাজলুমের পক্ষে হানাদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এই দরবারের অন্যতম নীতি।

চরমোনাইর এই মারকায এখন ব্যপক সমৃদ্ধ ও সুসংহত। বাস্তবতা বলতে কী চরমোনাই সম্ভবত এখন শুধু একটা দরবার নয় বরং একটা আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও চিন্তাধারার নাম। কারণ, চরমোনাইকে এখন শুধু দাওয়াতি মারকায কিবা আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র অথবা রাজনৈতিক প্লাটফর্ম বলে ব্যক্ত করা অসম্ভব। বরং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ একটা ইজম বা মিশন হচ্ছে চরমোনাই মারকায। এই মারকাযের যেই মিশন আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সুযোগ্য সাহেবজাদা আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. তার অগ্রগতি ও সমৃদ্ধকরণে কাজ করেছেন। এবং তার ৩৩ বছরকাল দায়ীত্ব পালনকালে ব্যপক প্রসারও ঘটেছে।

বিশেষত বহির্বিশ্বে এই মিশনের আহ্বান ও জনসম্পৃক্ততা এই সময়কালেই বেশি হয়েছে। এবং তিনি মৌলিকভাবে ৪ টি মিশন ঘোষণা করে গেছেন। সে হিসেবে আমি যদি চরমোনাইর গোটা মিশনের প্রত্যেকটা মিশনকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে যাই তাহলে এই মারকাযের অবদান অসংখ্য ও অসামান্য। এই ক্ষুদ্র প্রয়াস তার জন্য যথেষ্ট নয়।

বর্তমানে চরমোনাই মারকায কেন্দ্রীক পরিচালিত যুগোপযোগী সেই ৪ মিশন হচ্ছে- ১. বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি ২. চরমোনাই জামেয়া ৩. বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড ৪. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

সুতরাং এই মিশনগুলোর প্রতিটির অবদানও নিঃসন্দেহে এই মারকাযের অবদান। অবশ্য এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখন নাই। তবে এগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা না করলেই নয়। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশ মুজাদিহ কমিটি ও চরমোনাই আলিয়া মাদরাসা সৈয়দ ইসহাক রহ. প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। যদিও তিনি মূলত কওমী মাদরাসাই কিন্তু উপযুক্ত ছাত্র না পাবার দরূণ মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলে আলীয়া নেসাবে পরিচালিত করেন। আর একথা কারো অজানা নয় যে তৎকালে কওমী ও আলিয়া নেসাবের তফাৎ সামান্যই ছিলো। পরবর্তীতে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. ১৯৮৩ সালে কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে দুটোর সমন্বয়ে জামেয়া ঘোষণা করেন। এবং তিনিই সুগভীর চিন্তার আলোকে বাংলার ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ড গঠন করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মৃত্যূর পূর্ব পর্যন্ত তিনিই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

বর্তমানে এই বোর্ডের অধিনে মানসম্মতভাবে ১৬০০০ এর অধিক মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে। শায়খ রহ. বলতেন, কেজি স্কুল নামে প্রভাতী স্কুলগুলো হচ্ছে ইয়াহুদি খৃষ্টানদের ষড়যন্ত্রের ফসল। তারা চায় মুসলমানের সন্তানদের সকালের মক্তব বিমুখ করে স্কুলমুখী করতে। যাতে করে কুরআনের শিক্ষা উঠে যায়। এজন্যই তিনি সাধারণ শিক্ষা ও কুরআনি শিক্ষার সফল সমন্বয় ঘটিয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করেন এবং এই বোর্ড গঠন করেন। শায়খ রহ. বলতেন, শত্রু যেভাবে ঘায়েল করে মোকাবেলা সেভাবেই করতে হয়। আশা করা যায় অচিরেই হয়তো শায়খের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। এবং এদেশে কুরআনি শিক্ষা ব্যপক থেকে ব্যপক প্রসারিত হবে ইনশাআল্লাহ। মানব রচিত শোষণের যাঁতাকল থেকে মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. ১৯৮৭ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (অধুনা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে এর সহযোগী সংগঠনগুলোও প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আমি যাচ্ছিনা। তবে এতটুকু বলতেই হয় যে, চরমোনাইর হযরত পীর সাহেবগণ সবসময়ই ইসলামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ও সক্রিয় ছিলেন। আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. ১৯৫৭ সালে ছাত্রজীবন শেষ করার পরে তার শ্রদ্ধেয় পিতার অনুপ্রেরণায় তৎকালীন হাক্কানী ওলামাদের সর্ববৃহৎ সংগঠন নেযামে ইসলাম পার্টিতে যোগদান করেন। উল্লেখ্য, এই সংগঠনটি হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভীর রহ. অন্যতম খলিফা আল্লামা আতাহার আলী রহ. ১৯৫৪ সালে গঠন করেছিলেন। আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. ছিলেন এই নেযামে ইসলাম পার্টির সহ-সভাপতি। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে আল্লামা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. তার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ ও শাইখ হযরত হাফেজ্জী হুজুরের সংগঠন খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং নায়েবে আমীর নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে হযরত হাফেজ্জী হুজুরের রহ. এর ইন্তেকালের পরে তাঁর আপনজনদের কারণেব দলটিতে অন্তর্দন্দ শুরু হলে তিনি নিরপেক্ষতা অবলম্বন করেন। এবং দলটির এহেন বিপর্যয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এরপর তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আর সে ইতিহাস সম্ভবত কারো অজানা নয়। তবে এখানে একটা কথা হচ্ছে অনেকেই আপত্তি করে থাকেন যে, আল্লামা সৈয়দ ইসহাক রহ. তো রাজনীতি করেননি, তার অধস্তন পুরুষ কেন করেন। সম্ভবত এই ইতিহাসটুকু তাদের জন্য কাজে দেবে। ৩০ বছরের ব্যবধানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন এদেশের রাজনীতিতে আশার আলো। উদীয়মান তৃতীয় শক্তি। ইসলাম দেশ ও মানবতার স্বার্থে যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে এই সংগঠনটি এখন জনগণের আস্থার প্রতীক। মনে রাখতে হবে, চরমোনাই মারকায কেন্দ্রিক পরিচালিত মিশনগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে আত্মশুদ্ধি ইসলামী শিক্ষা ও মানব চরিত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সুস্থ সুন্দর পরিবর্তন ও আদর্শিক বিপ্লবের মাধ্যমে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন। সে লক্ষ্যে এই মারকাযের কাজ আরো বেগবান ও জনসম্পৃক্ত হোক। আরো সুন্দর ও সমৃদ্ধ হোক এই কামনা।

লেখক, তরুণ আলেম, গবেষক ও আলোচক চেয়ারম্যান,

হিউম্যান রাইটস প্রটেকশন মুভমেন্ট

2736Shares