| |

২২৯ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী চূড়ান্ত

প্রকাশিতঃ ২:৫৬ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৮

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। এজন্য প্রার্থী বাছাইসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে দলটি। এরই মধ্যে ২২৯ আসনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে দলটি। এতে দলের প্রধান মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের নাম নেই। তবে তার দুই ভাইসহ দলের শীর্ষ ও স্থানীয় অধিকাংশ নেতা স্থান পেয়েছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দলের মজলিসে আমেলার বৈঠকে এ প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। বাকি আসনগুলোর প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম শিগগিরই শেষ হবে বলে জানা গেছে। এতে চরমোনাই পীরের আরও এক ভাই সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা পেলেই তাতে ইসলামী আন্দোলন অংশ নেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো কোনো নির্বাচন হলে তাতে দলটি অংশ নেবে না বলেও সিদ্ধান্ত রয়েছে।

জানা গেছে, দেশের অন্যতম প্রধান এ ইসলামী দলকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ইসলামী আন্দোলনকে জোটে ভেড়াতে পৃথক তৎপরতা চালায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আসন ভাগাভাগিসহ নানা প্রস্তাবও দেওয়া হয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। বিভিন্ন ইসলামী দলের পক্ষ থেকেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত মত বা দলীয় স্বার্থের মিল না হওয়ার কারণ দেখিয়ে একলা চলো নীতিতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। আর অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ার অভিযোগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি ইসলামী আন্দোলন।

ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আহমদ আবদুল কাইয়ুম জানান, এবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন মহল থেকে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে আমাদের দলকে। এরই মধ্যে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে তারা। ইসলামী ঐক্যজোটের নেতৃত্বে আলাদা একটি ইসলামী জোট গঠনের চলমান প্রক্রিয়ায় অংশ নিতেও প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। তবে তাতেও সাড়া দিচ্ছে না দলটি। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও যোগ দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাদের নেই। বরং ‘ইসলামী হুকুমত’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনে ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে এককভাবেই অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

৩০০ আসনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার কারণ বর্ণনা করে ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের রাজনীতিতে অযোগ্য ঘোষণা, কালো টাকা এবং পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য বন্ধ, নির্বাচনের জন্য আনুপাতিক হারে (চ.জ) পদ্ধতির নির্বাচন, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ আদর্শ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

কারণ দূষিত, বিষাক্ত, কলুষিত ও নোংরা রাজনীতির ক্ষতবিক্ষত ছোবল থেকে দেশ, জাতি এবং মানবতাকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ইসলাম; আর ইসলাম কায়েমের জন্য প্রয়োজন সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব, আদর্শবান সুসংগঠিত সংগঠন ও কাক্সিক্ষত জনসর্মথন। সংগঠনের নেতাকর্মী এমন হবেন, যারা মহান আল্লাহর কাছে, জনগণের কাছে এবং নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন; দেশের উন্নয়ন ও মানবসেবাকেই রাজনীতির লক্ষ্যবস্তু বানাবেন। ইসলাম ছাড়া দেশ, জাতি ও মানবতার মুক্তি নেই। দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আহমদ আবদুল কাইয়ুম জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ে দলের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে গেল বছরের মাঝামাঝি। সব জেলায় দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে আসনপ্রতি তিনজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করার নির্দেশনা দেওয়া হয় কমিটির পক্ষ থেকে। প্রাপ্ত নামগুলো কেন্দ্রীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার শেষে কোথাও একজন আবার কোথাও একাধিক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মজলিসে আমেলার বৈঠকে প্রার্থী বাছাই করা হয়। এতে সর্বসম্মতিক্রমে ২২৯ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। বাকিদের বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করে শিগগিরই নাম প্রকাশ করা হবে।

প্রাপ্ত প্রার্থী তালিকায় দেখা গেছে, দলের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদ প্রার্থী হবেন খুলনা-৪ আসনে। চরমোনাই পীরের ভাই ও দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রার্থী হবেন বরিশাল-৫ আসনে। অপর ভাই ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী ঢাকা-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এছাড়া চরমোনাই পীরের আরেক ভাই সৈয়দ এছহাক মো. আবুল খায়ের বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ আসনের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ২২৯টি আসনের প্রার্থীর নাম দলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে। এরপরই তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করবেন। দলের প্রার্থী বাছাই কমিটি সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, তাকওয়া, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান, আত্মীয়-স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় ইত্যাদি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়া হলেও এগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’Ñ এ তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে। ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়লাভের ব্যাপারে জোর চেষ্টা করা হবে দলের পক্ষ থেকে। এর সংখ্যা ৩০ জনের মতো হতে পারে। বাকি ক্যাটাগরির প্রার্থীদের নিয়ে তুলনামূলক কম প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা করবে দলটি।

জানা গেছে, ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ একটি ইসলামী মোর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ৯০ সালের দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মোর্চাটি চরমোনাইয়ের মরহুম পীর মুফতি ফজলুল করিমের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২০০৮ সালে নিবন্ধনের সময় দলটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ করা হয়। চরমোনাই পীরের এ দল প্রথম দিকে নির্বাচনবিমুখ হলেও একপর্যায়ে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় নির্বাচনে ১৬৫টি আসনে প্রার্থী দেয় দলটি। তবে তাদের কেউ জয়লাভ করতে পারেননি। ওই নির্বাচনে ভোটপ্রাপ্তির হার ছিল ১ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার অভিযোগে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। অবশ্য বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। যদিও নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার অভিযোগে কিছু নির্বাচন বর্জনও করে দলটি। কয়েকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিতও হয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলটির ভোটের সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন নেতারা।

দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ

2106Shares