| |

স্বতন্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক বলয় সৃষ্টির কারিগর সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.

প্রকাশিতঃ ১:৫০ পূর্বাহ্ণ | জুলাই ২৮, ২০১৮

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে স্বতন্ত্র একটি ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ নিয়ে ১৯৯১ সনে ৬টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো ইসলামী ঐক্যজোট।

তখনকার সময়ে দেশের অন্যতম বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম নেতা সিলেটের শায়খে কৌড়িয়া রহ. সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.কে নবগঠিত ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের আহবান করেছিলেন। কিন্ত সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. নিজের ওস্তাদ শায়খুল হাদীস সাহেব রহ.কে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হতে রাজি হননি, হয়েছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান। ফলে তৎকালীন সময়ে শায়েখে কৌড়িয়ার নেতৃত্বাধীন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ইসলামী ঐক্যজোটে সম্পৃক্ত হয়নি।

১৯৯৫ এর দিকে ইসলামী ঐক্যজোটের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় জোট শরীক খেলাফত মজলিসের সদস্যপদ স্থগিত হলে হযরত শায়খুল হাদীস রহ. চেয়ারম্যানের পদও স্থগিত হয়ে সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. তখন ইসলামী ঐক্যজোটের সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান হন।

তৎকালীন সময়ে তসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারীও ছিলেন সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. যার সদস্য সচিব ছিলেন মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.। জনাব আমিনি সাহেব তখন পর্যন্ত ইসলামী ঐক্যজোটে’র সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না।

১৯৯৬ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে তৎকালীন ইসলামী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে সকল ইসলামী শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টির জন্য সাপে নেউলে সম্পর্ক থাকা হযরত শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ. ও মুফতী আমিনী রহ. তৎকালীন সময়ে দুজনই জোটের বাইরে থাকায় তাদেরকে ইসলামী ঐক্যজোটে সম্পৃক্ত করে উম্মাহর ঐক্যের বৃহত্তর স্বার্থে আবারো চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাড়িয়ে শায়খুল হাদীস আজিজুল হক সাহেবকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন।

ইসলামী ঐক্যজোটের সভায় সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.কে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও পার্লামেন্টারী বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে কিছুদিন পরে দলীয় কিছু জটিলতা সমাধান করে মুফতী আমিনী রহ.কে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এরপূর্বে পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. ও আল্লামা সুলতান যওক সাহবদের নেতৃত্বে গঠিত সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ জামায়াতে ইসলামী ব্যাতিত সকল ইসলামী দল বিলুপ্ত করে একটি দলের ভেতরে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে উদ্যোগ নিলে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জামেয়া রহমানিয়া মাদরাসাতে অনুষ্ঠিত সভায় পীর সাহেব চরমোনাই রহ. স্পষ্ট করে বলে দেন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলে ইসলাম পন্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে আমি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে (তৎকালীন নাম) বিলুপ্ত করে ওলামা হযরতদের সিদ্ধান্তে মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছি।

আল্লামা সুলতান যওক নদভী সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী এমন বক্তব্য কেবল পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ই দিয়েছেন।

পরবর্তীতে ১৯৯৯ সনের দিকে ৪ দলীয় জোট গঠনে ইসলামী ঐক্যজোটকে বিএনপি আমন্ত্রণ জানালে জোটের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিলো ক্ষমতায় গেলে ৮ দফা দাবী বিএনপি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেই ইসলামী ঐক্যজোট ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে জোটে যেতে প্রস্তুত রয়েছে।

কিন্ত ইসলামী ঐক্যজোটের ৮ দফা সম্পর্কে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়া বলেছিলেন, আমরা ক্ষমতার রাজনীতি করি আপনার ক্ষমতার অংশীদার হয়ে জোট করলে আসতে পারেন, ইসলাম কায়েম আমাদের উদ্দেশ্য নয় এটা আপনাদের এজেন্ডা আপনারা ক্ষমতায় গেলে ৮ দফা বাস্তবায়ন করবেন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এ কথার কারনে ইসলামী ঐক্যজোটের সভায় ৪ দলীয় জোটে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত হলেও রাতের আধারে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে না জানিয়ে তৎকালীন জোটের ৩/৪ জন নেতা ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে ৪ দলীয় জোটে যোগ দেয়।

আর এতেই সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর স্বপ্ন ইসলামী দলসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বতন্ত্র ইসলামী বলয় সৃষ্টির উদ্যোগ হোচট খায়।

যে কোনোভাবে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করা নয় রবের রাজি খুশির জন্য আদর্শ ও ইবাদাতের রাজনীতিকে অব্যাহত রেখে স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ ইসলামী রাজনীতিতে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরণ ইসলামী জাগরণ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.

তিনি সব সময়ে বলতেন আমি যে কারনে নামাজ, রোজা, হজ্জ  করি, যাকাত দেই, পীর-মুরিদী করি একই কারনে ইবাদাত মনে করে ইসলামী রাজনীতি করি, দুনিয়াবী কোনো স্বার্থে আমি রাজনীতি করিনা। যদি কেউ আমাদের সাথে জোটবদ্ধ হতে চায় তবে তাকে ইসলাম শ্বীকার করে ৮ দফা মানতে হবে।

কারণ আমাদের নেতা কর্মীরা ইসলাম কায়েমের জন্য রাজনীতি করে তাই আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ  করলে তারা শহীদ হবেন, ইসলামী দাবী বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করতে অশ্বীকার করা কোনো জোটে শরীক হলে সে জোটের দেয়া কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে কেউ মারা গেলে সে শহীদ হবে কিনা এবিষয়ে স্পষ্ট ফতোয়া না আসা পর্যন্ত আমরা এমন কোনো জোটে যোগ দিবো না।

এর ধারাবাহিকতায় বিগত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামী শক্তির জাগরণ দেশবাসী দেখতে পেয়েছে। চলমান বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অংশ নেয়া জাতীয় গণমাধ্যম গুরুত্বসহকারে দেখছে।

তিন সিটির মধ্যে বরিশাল সিটি নির্বাচনে হাফেজ মাওলানা ওবায়দুরহমান মাহবুব যিনি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মাহমুদিয়া মাদরাসার মুহতামিম, হেফাজতে ইসলামের বরিশাল বিভাগের আমীর। অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যার বিজয় লাভের সম্ভাবনা অনেক।

জনাব ওবায়দুর রহমান মাহবুব সাহেব ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নয়, যে কোনো দল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করলে তাঁর পক্ষে ২০ দলীয় জোটের শরীক ইসলামী দল সমূহসহ সকল ইসলামী দলের নেতারা অংশ নিবেন এটাই ছিলো স্বাভাবিক।

যদি তাঁর চেয়ে বড় কোনো ইসলামী পন্ডিত, আবেদ প্রার্থী হতেন তবে ভিন্ন কথা। হাফেজ মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুব সাহেবের বিরোধীতা অন্ততপক্ষ কোনো ইসলামী দল করতে পারে বলে আমি শুধু নয় দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ মনে না।

যদি জোটের পক্ষ থেকে তাদের উপর চাপ দেয়া হয়েও থাকে তবে তাদের এতটুকু বলার প্রয়োজন ছিলো হাফেজ মাও. ওবায়দুর রহমান মাহবুবের বিপরীত  প্রার্থীর পক্ষে আমরা প্রচারে যেতে পারবো না।

এতটুকু করতে না পারায় প্রমাণ হয়েছে এসব ইসলামী দল নাকে খত দিয়ে মেরুদন্ডহীন হওয়ার কারনে একজন সাচ্চা মর্দে মুমিন ইসলামী পন্ডিত ও আবেদ হাফেজ মাওলানার পক্ষে দাড়াঁতে পারেনি।

তাঁরা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ঐক্যের কথা বলে ১৯৯৯ যে চার দলীয় জোটে ছিলেন তাঁদের সে শ্লোগান এখনো আছে কিন্ত নিজেদের দলের ভিতরেই পদের লোভে দল বিভক্ত হয়ে আছে।

যখন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ৩ ভাগে বিভক্ত, খেলাফত মজলিস বর্তমানে ৩ ভাগে বিভক্ত, ইসলামী ঐক্যজোট ৬ ভাগে বিভক্ত, নেজামে ইসলাম পার্টি ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকার পরে তাদের মুখে আর ঐক্যের কথা মানায় না।

তাদের কেউ ২০ দলীয় জোট, কেউ আওয়ামী জোটের সহযোগী। অতএব একথা বুঝতে বাকি নেই এরা মেরুদন্ডহীন নাকে খত দেয়া তাদের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।

তাই সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. চিন্তা বাস্তবায়নে হাতপাখা মার্কার প্রার্থীদেরকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সকলের কর্তব্য।

 

শহিদুল ইসলাম কবির

কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী কৃষক-মজুর আন্দোলন ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক, ইসলামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরিষদ।

 

0Shares