| |

ভোটের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলনের উত্থান যেভাবে

প্রকাশিতঃ ১০:৪১ অপরাহ্ণ | জুলাই ০৭, ২০১৮

আমাদের দেশের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর কাছে ‘ইসলামী ভোটব্যাংক’ আলাদা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। একই কারণে ইসলামী দলগুলোরও এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। গত বছর তিনেকের মধ্যে অনুষ্ঠিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে। আওয়ামীলীগ-বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে পেছনে ফেলে তারা উঠে এসেছে তৃতীয় অবস্থানে। সবশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তাদের অবস্থান তৃতীয়। ভোটের রাজনীতিতে তাদের এই অগ্রগতি দৃষ্টি কেড়েছে সর্বমহলের।

গত ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আওয়ামীলীগ ও বিএনপির পরেই তাদের অবস্থান। দলটির প্রার্থী মাওলানা নাসির উদ্দিন হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট। নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি বলে দলটির অভিযোগ। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের ভোট ৫০ হাজার ছাড়াত বলে দাবি দলটির।

সর্বপ্রথম ২০১৫ সালে ঢাকার দুই সিটিতে তৃতীয় অবস্থান লাভ করে আলোচনায় আসে ইসলামী আন্দোলন। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী তৃতীয় হন। রংপুরে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী চতুর্থ স্থানে থাকলেও তাদের ভোট তৃতীয় হওয়া বিএনপির প্রায় কাছাকাছি। আর গত মে মাসে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তারা তৃতীয় হয়। বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ে তাদের ভোট ছিল অনেক বেশি।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৮ হাজার ৫০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন ইসলামী আন্দোলনের তরুণ নেতা শেখ ফজলে বারী মাসউদ। তার ভোট তরুণ নেতা বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী, বাম জোটের জুনায়েদ সাকীর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। আর ঢাকা দক্ষিণে ১৪ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন ইসলামী আন্দোলনের নেতা আবদুর রহমান। এরপর নারায়ণগঞ্জে তৃতীয় স্থান লাভ করেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মাছুম বিল্লাহ। তিনি পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৯১৪ ভোট। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির মনোনীত প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা পান ২৩ হাজার ৭১৮ ভোট। সেখানে বিএনপির প্রার্থীর ভোট ছিল ৩৪ হাজারের একটু বেশি। খুলনা সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুজাম্মিল হকের ভোট ছিল প্রায় ১৫ হাজার। যেখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর ভোট মাত্র দেড় হাজার। আগামী ৩০ জুলাই যে তিনটি সিটি করপোরেশনে ভোট হবে এর মধ্যে বরিশালে দলটি ভালো করবে এমনটাই আশা করছে সংশ্লিষ্ট নেতারা। কারণ বরিশালেই দলটির উৎপত্তি। সেখানে তাদের একটি বড় ভোটব্যাংক আছে বলে মনে করা হয়। ইতিমধ্যে মেয়র পদে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে দলটি।

আওয়ামীলীগ-বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বাইরে ভোটের রাজনীতিতে সাধারণত জামায়াতে ইসলামীকে গণ্য করা হতো। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি হয়ে প্রায় অস্তিত্ব হারাতে বসা দলটির এখন নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনই নেই। দলীয় পরিচয়ে তাদের আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। জামায়াতে ইসলামীর সেই অবস্থানে অনেকটা চলে এসেছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। যদিও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রচণ্ড জামায়াতবিরোধী মনোভাব রয়েছে তাদের মধ্যে। তাছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী কোনো অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে নেই।

১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে দলটির জন্ম হলেও ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি বাদ পড়ে। সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর খলীফাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তক্রমে পীর নির্বাচিত হন তার ছেলে মুফতি সৈয়দ মুহা. রেজাউল করীম। তিনিই এখন চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত। দলেরও তিনিই প্রধান। এই তরীকার মূল কেন্দ্র বরিশালের চরমোনাই হলেও সারা দেশেই রয়েছে দলটির কার্যক্রম। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আছে ইসলামী আন্দোলনের কমিটি। ধর্মভিত্তিক সমমনা অন্যান্য দলের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে তাদের অবস্থান শক্তিশালী। এ কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা দিন দিন ভালো করছে। দেশের কয়েকটি ইউনিয়নে তাদের দলীয় চেয়ারম্যান রয়েছেন। আছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরও।

স্থানীয় সরকারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তেমন চমক দেখাতে না পারলেও দলটির উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই দলটি অংশ নিয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে ভোটে উন্নতি করেছে। জানা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে নির্বাচন করে দলটি। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় এককভাবে। ওই নির্বাচনে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এরপর ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করে ২৩টি আসনে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৯টি ভোট পায়।

জামায়াতে ইসলামী বাদে ধর্মভিত্তিক কোনো দলের এককভাবে ভোটের রাজনীতিতে এই উত্থান চোখে পড়ার মতো। দলটির দিন দিন এই উন্নতির কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারা কোনো জোটে নেই। নব্বইয়ের দশকে শায়খুল হাদিস-আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটে থাকলেও বিএনপির সঙ্গে জোট করার সময় তারা সরে যায়। দলটি নারী নেতৃত্বকে হারাম মনে করে এবং এ ব্যাপারে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করলেও নির্বাচনে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি দলটি। এরপর আর কোনো জোটে যায়নি চরমোনাই পীরের দল। আওয়ামীলীগের সঙ্গে তাদের একটা সখ্য আছে বলে বাজারে প্রচার রয়েছে। যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আওয়ামীলীগ অন্যান্য ইসলামী দলের চেয়ে তাদেরকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয় বলে অভিযোগ আছে। তবে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দলটি। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তারাও বর্জন করে। আওয়ামীলীগের সঙ্গে সখ্য থাকলে এই নির্বাচন বর্জন করার কথা না এমনটাই দাবি দলটির নেতা-কর্মীদের।

জামায়াতে ইসলামীর বাইরে দেশে আরও বেশকিছু ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে। প্রায় ডজনখানেক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। তবে দলগুলো নানা সময় বিভিন্ন জোটের রাজনীতিতে জড়িয়ে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্বের কারণে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে। প্রতিটি দলই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং নির্দিষ্ট এলাকাতেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। একমাত্র ব্যতিক্রম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অন্য ইসলামী দলগুলো যেখানে কয়েক দফা ভাঙনের মুখে পড়েছে সেখানে এই দলটিতে এখনো কোনো ভাঙন বা বড় ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়নি। এজন্যই দিন দিন ভালো করছে দলটি। এই ধারা বজায় রাখতে পারলে আগামী দিনে ইসলামী আন্দোলন এদেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলতে পারবে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

জহির উদ্দিন বাবর: বার্তা সম্পাদক, ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম

1918Shares