| |

বরিশাল সিটি নির্বাচনে হাতপাখা নিয়ে বেকায়দায় জোট মহাজোট

প্রকাশিতঃ ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ | জুলাই ০৫, ২০১৮

আব্দুল ওহাব, বিশেষ প্রতিবেদক : আসন্ন বরিশাল সিটি নির্বাচন জটিল সমীকরণে ফেলে দিয়েছে আওয়ামী-বিএনপি জোটের রাজনীতিকে। ডানপন্থী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বুলি আওড়ানো বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আল্লামা উবায়দুর রহমান মাহবুবকে প্রার্থী করেছে খ্যাতিমান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছতার ভাবধারা প্রবর্তনকারী সংগঠনটির সূতিকাগার বরিশাল। মাওলানা উবায়দুর রহমান মাহবুব সংগঠনটির সাবেক জেলা সভাপতি। বরিশালের মাটি ও মানুষের সাথে রয়েছে তার সুখ-দুঃখের সম্পর্ক। বরিশালের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদরাসার মহাপরিচালক তিনি। অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপিতে রয়েছে কোন্দল। এ দুটি বিষয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, নগর সভাপতি ও সাবেক মেয়র সরোয়ারকে।

একসময় বরিশাল নগরী তথা বরিশাল সদর আসনকে বলা হয় বিএনপির ভোটের ঘাঁটি। জনগণের ধর্মীয় আবেগ অনুভূতির কথা বললেও সংকটকালে পাশে থাকেনি তারা। গণপ্রত্যাশা মূল্যায়িত হয়নি ইসলামী ভাবধারার শ্লোগানধারী সংগঠনটির কাছে। ফলশ্রুতিতে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভোটের ঘাঁটিতে ধস নামার আভাস পাওয়া যায়। অতীতে যেখানে সদর আসনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হতেন সেখানে ওই নির্বাচনে মাত্র পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন মজিবর রহমান সরোয়ার। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম প্রায় ৯৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। আবার ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরন পরাজিত হলেও ভোট পেয়েছিলেন ৬৬ হাজারের বেশি। আগের সিটি নির্বাচনে তিনি ২০ হাজার ভোট বেশি পেয়েছিলেন।

ভোটের এ সমীকরণে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, অতীতে বারবার ধোকা খেয়ে পিষ্ট হওয়া বরিশালবাসী এবার পরিবর্তন দেখতে চায়। জাতীয় রাজনীতিতে গণধিক্কার অর্জনকারী আওয়ামীলীগের নৌকা আস্থা হারিয়েছে জনমনে। প্রথমবারের মতো বরিশালের মানুষের আপনজন পীর সাহেব চরমোনাই নেতৃত্বাধীন দল ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ভোটের মাঠে অস্বস্তিতে পড়েছেন নৌকা-ধানের প্রার্থীরা। বিগত তিনটি সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী না থাকায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বেশিরভাগ ভোট পেয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী। এবার তারা প্রার্থী দেওয়ায় ওই ভোট আর বিএনপি পাবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

হাতপাখা প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির গণমাধ্যম সমন্বয়ক মাওলানা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ফলাফলে তারা দেখেছেন গত ৮-১০ বছরের তুলনায় তাদের ভোট বেড়েছে ৬ থেকে ৭ গুণ। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী প্রায় ২৯ হাজার ভোট পান। তার মধ্যে নগরের ভোট ১৫ হাজার হয়ে থাকলে এবং গত ১০ বছরে যদি ৫ গুণ ভোটও বাড়ে তাহলে তাদের ভোট ৯০ হাজারের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। তাই বিসিসি নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরিশাল নগর সেক্রেটারি ও হাতপাখা প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা জাকারিয়া হামিদী বলেন, ‘এবারের নির্বাচন অন্য নির্বাচনের মতো নয়। এবার বরিশালের সব আলেম, ওলামা, ইসলামী জনতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এক হয়েছে চরমোনাই পীরের হাতপাখার প্রার্থীর পক্ষে। হাতপাখা প্রার্থী সর্বমহলে শ্রদ্ধাভাজন হওয়ায় আমাদের ভোট ব্যাংক আরও শক্তিশালী হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরাই বিজয়ী হবো।’

‘হাতপাখা’ যেমন সরোয়ারকে বেকায়দায় ফেলেছে তেমনি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও তার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম কিংবা নির্বাচনী কোনো কর্মকাণ্ডে এখন পর্যন্ত বরিশাল বিএনপির তিন শীর্ষ নেতাকে পাশে পাননি সরোয়ার। ওই তিন শীর্ষ নেতা হলেন- কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চান ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামাল। সরোয়ারকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকেই ওই তিন নেতা ঢাকায় অবস্থান করছেন। তাদের অনুসারীরাও যাচ্ছেন না সরোয়ারের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে। এ ছাড়া গত ৩০ জুন সরোয়ারের বাসভবনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী প্রস্তুতি সভায়ও যাননি বর্তমান মেয়র কামালের ঘনিষ্ঠ ৭-৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী। নগর বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাও রয়েছেন এই দলে। আবার ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে।

দলে বিভেদ প্রসঙ্গে মেয়র প্রার্থী সরোয়ার বলেন, ‘আমি মনোনয়ন চাইনি। দল আমাকে প্রার্থী করেছে। এখানে বিএনপিতে কোনো বিভেদ নেই। যারা মনোনয়ন চেয়েছিলেন প্রতীক বরাদ্দের পর তারা সবাই আমার সঙ্গে মাঠে নামবেন।’

বরিশালের গণমানুষ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে উবায়দুর রহমান মাহবুবকেই নগর পিতা বানাতে ইচ্ছুক বলে মনে করেন বোদ্ধামহল। মাহবুব সাহেব প্রার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক ক্লিন ইমেজধারী। সততা ও আমানতদারীতায় বহু আগে থেকেই সুবিদিত। ন্যায়বিচারে সিদ্ধহস্ত বলে মানুষ বিভিন্ন বিচারিক কাজে তাঁকেই সালিশ মেনে থাকেন।

0Shares