| |

জোটের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ ২:৪৭ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৪, ২০১৮

জোটের রাজনীতি বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির বিন মুহাম্মদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা জোটকে পরাজিত করে ক্ষমতার বাইরে থাকা জোট বিজয় লাভ করেছে। মালয়েশিয়ার এ জোট মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলো।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জোটের রাজনীতি ও ইসলামী দলে সমূহঃ

১৯৯৬ সনে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে আওয়ামীলীগ ২১ বছর পরে রাস্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়। ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট ক্ষমতাসীন হয়।

বর্তমানে চারদলীয় জোট ঘোষিত ২০ দল হলেও প্রকৃত পক্ষে প্রায় ২৫ দলের জোটে পরিণত হয়েছে। মূলের ৪ দল থেকে কিছু নবসৃষ্ট দল আবার ২০ দলের বাইরে রয়েছে।

আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে জাতীয় পার্টি যোগদান করায় তাদের জোটের নাম হয়েছে মহাজোট। ক্ষমতায় থাকায় সুযোগসুবিধার লোভে মহাজোটে আরো কিছু দল যোগ দিবে দিচ্ছে।

উভয় জোটের মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া। আর নিজ দল জোট ক্ষমতাসীন হলে নিজেদের আখের গোছানো অর্থাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, চাকুরীসহ অফিসে তদবির, সমর্থক ব্যাবসায়ীরা অবৈধ সুযোগ সুবিধা গ্রহণ। উন্নয়নের নামে রাস্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করা।

এর বাইরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শ্লোগান হচ্ছে- ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মূল শ্লোগান হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।

যে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারনে তাদের আমলে ইসলামের প্রকৃত অনুসারীদেরকে রাস্ট্র চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করে।

এত কিছুর পরেও দুই জোটের কোনো জোটই কিন্ত ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার কথা বলে না। এ বিষয়ে  কখনো তাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে- তবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করা ইসলামী দলসমূহ অমুককে নামাতে অমুককে উঠাতে এদের সাথে জোট করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে তবে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করার সুযোগ কতটুকু থাকে?

 

বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থাতে এসব জোটের শরীক হলে তাদেরকে নামমাত্র কয়েকটি আসন দিয়ে সারাদেশের ইসলামী সংগঠনের নেতা-কর্মীদেরকে ক্ষমতা লোভী কলঙ্কিত রাজনৈতিকদের পক্ষে ভোট চাইতে বাধ্য করা হলে তুলনামূলক আল্লাহভীরুদের নৈতিকতা কতটুকু থাকে?

প্রত্যেক নির্বাচনে যদি এভাবে দুই জোটের লেজুরবৃত্তি ইসলামপন্থীরা করতেই থাকে তবে তো একসময় এদেশে ইসলামী দলের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।

এখন ইসলামী দলসমূহকে ইসলামী রাজনৈতিক দল বললেও অদূর ভবিষ্যতে তা হবে ইসলামের নামে ক্ষমতায় যাওয়ার হুজুরদের রাজনীতি।

নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইসলামী দলসমূহ কার্যক্রম না চালালে দেশে স্বতন্ত্র ইসলামী দলও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কারন অন্যের দেখাদেখি বাকীরাও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সংযুক্ত হয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে যাবে।

সমাধান কিঃ- বাংলাদেশে একটি কথা বা শ্লোগান আমরা শুনে আসছি, সকল ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ হলে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে। ঐক্যের সে বিষয়কে সামনে রেখে আমার জানামতে ৯০ এর দশকের শেষের দিকে পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারুল মা’আরিফের সুলতান যওক নদভী সাহেব, গওহরডাঙ্গা মাদরাসার তৎকালীন প্রধান মুরব্বীর নেতৃত্বে গঠিত সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। এখানে প্রতিয়মান হয়েছে ইসলামী দল সমূহের কার্যকর ঐক্যকরে এক কাতারে আনা কোনভাবে সম্ভব নয়।

যার পরিপ্রেক্ষিতে সকল ইসলামী দল ঐক্যের কথা বাদ দিয়ে নিজেদের কর্মসূচী নিয়ে পথ চলা শুরু করে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী ঐকজোটে জোটের রাজনীতিতে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়ে সে জোটের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সকলেই কম বেশী অবগত।

পরবর্তীতে ফতোয়া বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যখন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে আন্দোলন চললো এ অরাজনৈতিক সংগঠনটিকে ও যখন বিএনপি জোটের সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চললো তখন থেকে রাজনৈতিক জোট, অরাজনৈতিকভাবে কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সতর্ক হয়। ভেবে চিন্তে সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইসলামী জনতার কোন পরিশ্রমের ফল যাতে আওয়ামীলীগ, বিএনপির কাছে কেউ বিক্রয় করে ফায়দা হাসিল না করতে পারে সে ব্যাপারে দলের নীতিনির্ধারকরা সকলেই সতর্ক।

জোট গঠনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিদ্ধান্তঃ

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান কায়েমের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারাও চায় বৃহত্তর জনগোষ্টীকে ঐক্যবদ্ধ করে ঈমানী এ আন্দোলনকে মূল লক্ষে পৌঁছাতে।

সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান ২০ দলীয় জোট, মহাজোটের সাথে আদর্শিক মিল না থাকায় যে জোটবাঁধা অসম্ভ তা হয়তো নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

দুই জোটের বাইরে থাকা ইসলামী দল সমূহের সাথে জোট করা যেতে পারে এখন এ প্রশ্ন আশা স্বাভাবিক।

 

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসছে। কিন্ত ঐ সকল ইসলামী দল কি চায় ? আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কিভাবে জোট সঙ্গী চায়?

প্রথম কথা হলো দুই জোটের বাইরে থাকা ইসলামী দলসমূহ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটবদ্ধ হয়ে আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়।

এতে যা হবে তা হলো, ঐসকল দলের পছন্দের এলাকাতে তাদের প্রার্থীদের অনুকুলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থকদের ভোট ভাগিয়ে নিজেদের একটি পুঁজি দাড় করানো| যা দেখিয়ে ভবিষ্যতে তারা বড় কোনো জোটের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বেশী সুযোগ সুবিধা নিতে পারে।

দ্বিতীয় কথা হলো- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেমন জোট চায়?

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চায় ইসলামী হুকুমত কায়েমের আন্দোলনে কার্যকর স্থায়ী ঐক্য। নির্বাচন কেন্দ্রীক জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের পরে যার অস্তিত্ব থাকবে না তেমন জোট গঠনের পক্ষে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেয়।

যে দল ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠায় জোটবদ্ধ হবে তাদের সাথেই কেবল ইসলামী আন্দোলন জোটবদ্ধ হতে চায়। এখানে এটাই মৌলিক বিষয়।

সহজ কথায় এভাবে বলা যায়- কেবলমাত্র নির্বাচনী নয় ইসলাম প্রতিষ্ঠায় জোটবদ্ধ হতে আগ্রহী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

 

শহিদুল ইসলাম কবির

কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী কৃষক-মজুর আন্দোলন।

795Shares