| |

ঐতিহাসিক প্রশ্ন-উত্তরঃ ইসলামী আন্দোলনের একটি জীবন্ত দলীল

প্রকাশিতঃ ৬:৪৪ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (শায়েখ চরমনাই রহঃ) খুলনা জিয়া হলে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন -এর (বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন) ঐতিহাসিক সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্ব (জনতার প্রশ্নের উত্তর)। যা আজো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উপর আরোপিত কতিপয় অভিযোগের দাঁতভাঙ জবাব ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একটি ঐতিহাসিক দলীল স্বরূপ।

প্রশ্নঃ আপনার দল যদি খাঁটি ইসলামী দল হয় তাহলে কিছু দিন হল ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতিতে নামলেন কেন ? আগে পাকিস্তান আমলে বা স্বাধীনতার পরে দীর্ঘকাল চুপ থাকলেন কেন ? তখন ইসলামী আন্দোলন ফরয ছিল না, না ইসলাম প্রচারে কোন সমস্যা ছিল ?

উত্তরঃ এটা একটা সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। আমাদের পূর্ব পুরুষ সবাই সবসময় ইসলামী আন্দোলন করেছেন। হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহঃ), রশীদ আহমাদ গংঙ্গুহী (রহঃ), শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ) সহ সবাই আন্দোলন করেছেন। আমার ওয়ালেদ সাহেব কেবলা (সৈয়দ এছহাক রহঃ) নেযামে ইসলামীর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। হাফেজ্জী হুযূর (রহঃ) ইসলামী আন্দোলন করেছেন। আমি তো তখন ছোট ছিলাম। আমার আন্দোলনের কথা মানুষে জানে না, আমি তো তাদের সঙ্গে ছিলাম। এখন বয়স যেহেতু বৃদ্ধি পেয়েছে এজন্য আমি সামনে এসেছি। আমি যে ইসলামী আন্দোলন করিনি এ কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

প্রশ্নঃ রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর রূহানী যাত বলা যাবে কিনা ?

উত্তরঃ আল্লাহ তায়ালার যাতী নূর থেকে যদি কেউ তৈরি হয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহ তায়ালার অংশ হবে। আমার ছেলে আমার শরীরের যেমন অংশ আর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি আল্লাহর যাতের নূর হয়ে থাকেন তাহলে তিনি এবং আল্লাহ এক জাতীয় হয়ে যান। এটা সম্পূর্ণ শিরক। গোলাম আযম (জামায়তে ইসলামীর সাবেক আমীর) সাহেব বলেছেন, আল্লাহর রূহানী সত্ত্বা তিনি, সর্ব বিষয়ের নেতা, এটা একটা শিরকী কথা। এ কথার দলীল হিসেবে ইনকিলাব পত্রিকার কাটিং আমার কাছে আছে। এটা রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে নিতে চাই, ধর্মীয় প্রশ্ন হিসেবে না। এ জন্যই বলি যে, কোন আলেমের নেতৃত্ব ছাড়া ইসলামী আন্দোলন হতে পারে না। প্রফেসর এর নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন হয় না।

প্রশ্নঃ সর্বত্র প্রচার করা হচ্ছে যে, গোলাম আযম নাকি আপনার কাছে লিখেছেন যে, তিনি আপনার সাথে মওদূদী সম্পর্কে আলোচনায় বসতে চেয়েছেন। আপনি নাকি রাজী হননি। বিষয়টির উত্তর প্রয়োজন।

উত্তরঃ আমি যে তাদের সাথে বসতে চেয়েছি তা পেপার পত্রিকায় দেখেছেন, না দেখেননি? কিন্তু তিনি যে আমার সাথে বসতে চেয়েছেন কোন পেপার পত্রিকায় দেখেছেন ? কাজেই তাদের যে মিথ্যা বলা চিরাচরিত অভ্যাস তার আরেকটা প্রমাণ পাওয়া গেল।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে যে কয়টি দল ইসলামী আন্দোলন করে, এর ভিতরে কোন দলটি ইসলাম প্রতিষ্ঠার যোগ্য এবং হক্ব?

উত্তরঃ এর বিচার তো আপনাদের হাতে, এর বিচার তো আমার হাতে নয়। যেহেতু আমি ইসলামী একটি দলের নেতৃত্ব দেই। এটা আমার বলা সম্ভব নয়। আপনারা বিচার করবেন কোনটা হক্ব। কুরআন-হাদীস এর ভিত্তিতে সাহাবা (রাঃ) এর নীতির উপরে কারা আছে- তা আপনারা বিচার করবেন।

প্রশ্নঃ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সর্বপ্রথম কার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কেন তারা বিচ্ছিন্ন হয় ?

উত্তরঃ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব। প্রথমে তার একার নেতৃত্বে একটা মিছিল বের হয়। তারপর দেখলেন যে, খুব জনপ্রিয়তা লাভ হচ্ছে। এরপর তিনি শাইখুল হাদীছ সাহেব, ব্যারিস্টার কোরবান আলী সাহেব, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব এবং মরহুম মাওলানা আঃ রহীম সাহেব এর নেতৃত্বে একত্রে মিছিল বের করেন। তারপর তারা যখন দেখলেন যে, এটা খুব সুন্দর দেখা যায়, তখন আমাকে আনার জন্য গিয়েছিলেন বগুড়ায়। মোখতার সাহেব, ব্যারিস্টার কোরবান আলী ও মাওলানা এছহাক সাহেব (যে মন্ত্রী ছিলেন) আমার কাছে গিয়েছিলেন। আমি বলেছি, “কমার্শিয়াল লোকদের কথা বিশ্বাস করি না। আমরা আন্দোলনে নামবো আর তারা পিছন থেকে সরে যাবে। শেষে আমাদেরকে বিপদে ফেলবে।” তখন আমি আর ঢাকায় যাইনি। এরপর এক ঘরোয়া বৈঠকে দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের টেবিলের উপরে কুরআন শরীফ ছিল, সেখানে ছয় জন লোক ছিল, তাদের সামনে সাঈদী সাহেব বললেন, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, কুরআন শরীফ সামনে রেখে বলছি, আমি এর থেকে পিছপা হব না। এ কসম খাওয়ার পর ব্যারিস্টার কোরবান আলী সাহেব আমার কাছে এসে বললেন যে, হুযূর! কসম করা হয়েছে। তখন আমি চিন্তা করলাম-কসম করার পর যদি তাকে বিশ্বাস না করি তাহলে আমারই ঈমানের ঘাটতি। তখন আমি বললাম, আমি যাব, কিন্তু নেতৃত্ব দেব না। আমি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতাও দেব না। এ শর্তের উপরে আমি গেলাম ৩ মার্চ। গিয়ে দেখলাম সাঈদী সাহেবের পত্রিকায় বিবৃতি- শাসনতন্ত্রের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তখন আমি বললাম কি ব্যারিস্টার সাহেব, ওরা পালিয়ে গিয়ে আমাদেরকে বিপদে ফেলবে এ কথা আমি বলিনি? তখন তিনি বললেন, হুযূর, এখন কি করব। তখন মরহুম মাওলানা আবদুল আহাদ আল-মাদানী সাহেব চিটাগাং এর ইমাম বললেন যে, আমার ছাগলটা কোথায়, দেখ তো। আমাকে চিঠি দিয়ে কোথায় গেল? এরকম বলছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা বললেন, তোমাকে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যারিস্টার সাহেব, আমি যে শর্ত দিয়েছিলাম, সে শর্তের কি হল ? তখন বাধ্য হয়ে মুরব্বীদের কথা রাখতে হল এবং বক্তৃতা দিলাম। তারপর তো ১৩ তারিখে কি ঘটনা ঘটলো তা আপনারা জানেন। এ হলো শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা। তাছাড়া, সাঈদী সাহেবের, আবদুল আহাদ আল-মাদানী সাহেবের, শাইখুল হাদীছ আল্লামা আযীযুল হক সাহেবের, আমার, আবদুর রহীম সাহেবের এবং বায়তুশরফের পীর সাহেবের দস্তখতসহ কুপন ছাপানো হয়। সে কুপন আমাদের কাছে এখনও আছে। কারো যদি দেখতে মনে চায় তাহলে শাসনতন্ত্র আন্দোলনের অফিসে যাবেন, দেখিয়ে দেয়া হবে।

সম্মানিত পাঠক বন্ধুগণ! হযরত পীর সাহেব চরমোনাইর বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য ১৯৮৭ সালের কমলাপুর রেলওয়ে ময়দানে তাফসীরুল কুরআন মাহফিলে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বক্তব্যের অংশ বিশেষ আছে।

3101Shares