| |

ইসলাম ও ইতিহাসে তাসাউফ চর্চা: প্রেক্ষিত চরমোনাই মাহফিল

প্রকাশিতঃ ৭:৪০ অপরাহ্ণ | মার্চ ০৬, ২০১৮

তারেক আদনানঃ মিডিয়া ফোকাসের অবহেলার মধ্যে অনেকটা নীরবেই সম্পন্ন হয় আরাফাহ এবং টঙ্গীর পর মুসলিম উম্মাহর তৃতীয় বৃহত্তম মহাসমাবেশ, বাংলাদেশের বরিশাল জেলার সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীবিধৌত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শোভিত দ্বীপে আয়োজিত “চরমোনাই মাহফিল”।

বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, পূর্নাঙ্গ ইসলামী পথনির্দেশনা এবং শুদ্ধ জিন্দেগীর অনুপ্রেরণার অন্যতম বড় এই মারকাজ হল তাওহীদ, সুন্নাহ, তাসাউফ, দাওয়াহ এবং সমাজবিপ্লব তথা জিহাদের প্রাণকেন্দ্র।

ভারতের আজমীরের ১২শ শতাব্দীর অন্যতম সুফি আধ্যাত্মিক সাধক খাজা মাইনুদ্দিন চিশতী রহ. এর স্মৃতিবিজড়িত চিশতিয়া-সাবেরিয়া সিলসিলার উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় মজমা হল চরমোনাই মাহফিল। বাংলাদেশে বিশুদ্ধ ধারার ইসলামের অন্যতম তীর্থস্থান।

চরমোনাই দরবার বাংলাদেশের তথাকথিত/গতানুগতিক শিরক-বিদাতে পরিপূর্ণ এবং শরীয়ত-সুন্নাহবিহীন কোন খানকাহ/দরবার নয়, বরং সময়ের সাথে সাথে এটি হয়ে উঠেছে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদা ও আমলের একনিষ্ঠ অনুসারীদের মিলনমেলা, শিরক-বিদাতের ঘোরবিরোধীদের কেন্দ্র এবং নবীজি সা. এর সুন্নাহের আলোকে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রে ইসলামী শরীয়তের বাস্তবায়ন প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমী এক মারকাজ।

চরমোনাই মাহফিলের অন্যতম বিশেষত্ব হল এটি এই আধুনিক যুগেও বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে নবীজি সা. এর জিন্দেগীর মূল চার কাজ তথা দাওয়াহ, তা’লিম, তাসাউফ এবং জিহাদ এর বাস্তব শিক্ষা, দীক্ষা, সমন্বয় এবং সঠিক পথনির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আর তাইতো প্রতিবছর বাংলাদেশ, ভারত,  আরবজাহানসহ সারা বিশ্ব থেকেই প্রখ্যাত শায়খ, উলামায়ে কেরাম, সুফিসাধনার ইমাম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুবাল্লিগ, শিক্ষক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীসহ লাখ লাখ দ্বীনভোলা, পথভোলা এবং শুদ্ধ জীন্দেগীর সবকপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ দলে দলে এখানে জমায়েত হয়।

বাংলাদেশে এই সিলসিলার মূল ব্যক্তিত্ব ক্বারী ইবরাহীম রহ. এবং সাইয়েদ ইসহাক রহ. যদিও ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে এই সিলসিলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাসাউফের অনেক উচ্চশিখরে আরোহন করেছিলেন, কিন্তু তাদের যোগ্য উত্তরসূরি সাইয়েদ ফজলুল করীম রহ. তাদের রেখে যাওয়া বিশুদ্ধ তাসাউফ চর্চার সিলসিলাকে সংস্কার করে স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কান্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন যার মিশনের ধারা এখনো চলমান।

সাইয়েদ ফজলুল করীম রহ. এর মিশনের শরীয়তী দর্শন ছিল- “তাসাউফ ছাড়া জিহাদ হল ফাসাদ, আর জিহাদ ছাড়া তাসাউফ হল বৈরাগ্যবাদ। এবং ইসলামে এই দুটির কোন স্থান নেই। তাই তাসাউফ ও জিহাদের সমন্বয় থাকতে হবে।” তাছাড়া, তার মিশনের রাজনৈতিক দর্শন ছিল- “শুধু নেতাই (অযোগ্য-অদূরদর্শী-দেশপ্রেমহীন) নয়, বরং নীতিরও (ব্রিটিশ পলিসি-আইন-কানুন-কালচার) পরিবর্তন করতে হবে। আর এই লক্ষ্যে তার যুগান্তকারী ঘোষণা ছিল- ধর্মহীন রাজনীতি শোষনের হাতিয়ার।” তাই সারাজীবন তিনি তাসাউফ চর্চার ক্ষেত্রে যেমন ছিলেন ঐতিহ্যবাহী চিশতিয়া-সাবেরিয়া তরীকায় চরমোনাই দরবারের পীর, তেমনি তিনি ছিলেন সমাজ ও দেশের সকল অন্যায়-অত্যাচার-দুর্নীতি, কায়েমী স্বার্থবাদী-জালিম-ফ্যাসিস্ট, রাজাকার-দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এবং ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠায় ময়দানের বীর।

সাইয়েদ ফজলুল করীম রহ. সম্পর্কে বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যের কান্ডারী, রাজনীতিক, বিশিষ্ট আলিম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. বলেছিলেন- “সাইয়েদ ফজলুল করীমের আন্দোলন ও দর্শনের সাথে আমি মিল খুঁজে পাই উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বালাকোটের অমর শহীদ সাইয়েদ আহমদের রহ. সাথে যার দর্শন ছিল তাসাউফ এবং জিহাদের সমন্বিত প্রয়াসের শক্তিতে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারতবর্ষে ইসলামী হুকুমত ফিরিয়ে আনা। তাই কলকাতাসহ ভারতের যেই শহরেই তিনি যেতেন এক হাতে মানুষদেরকে তাসাউফের বায়াত নিতেন এবং অন্য হাতে জিহাদের বায়াত নিতেন।”

মূলত তাসাউফ/তাজকিয়াহ (ফার্সিতে বলা হয় রূহানিয়াত, বাংলায় বলা হয় আত্মশুদ্ধি/আধ্যাত্মিকতা) চর্চা বা পীর-মুরিদীর ঐতিহ্য এবং সিলসিলা ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, ১৪শ বছরের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়।

তাসাউফ এসেছে আরবী শব্দ সউফ থেকে যার অর্থ পশম। তাসাউফের চর্চাকারীকে সুফি/সুফিসাধক বলা হয়। সুফিগনের পূর্বসুরীগণ পশমি পোষাক পরিধান করতেন বলে এই নাম। আবার কারো মতে, সুফি শব্দের উৎপত্তি আসহাবুস সুফফাহ থেকে যারা মসজিদে নববীতে আল্লাহির ইবাদাত ও ইলম চর্চায় লিপ্ত থাকতেন।এই আধ্যাত্মিক বা আত্মিক পরিশুদ্ধির সুফিধারায় যিনি শিক্ষক তাকে বলে পীর আর যিনি ছাত্র তাকে বলে মুরিদ। পীর ফার্সি শব্দ যাকে আরবীতে বলে শায়খ/মুর্শিদ। মুরীদও ফার্সি শব্দ যাকে আরবীতে বলে সালিক।

তাসাউফ হল ইসলামী শরীয়তের মগজ। এটা ছাড়া শরীয়ত অন্তঃসারশূন্য। কুরান-সুন্নাহ থেকেই এর উৎপত্তি। এই সম্পর্কে জুনায়েদ বাগদাদী রহ. বলেন- “যে কুরান মুখস্থ করেনি, হাদিস লিখেনি, তাসাউফে তার অনুগামী হওয়া যাবেনা। কারন আমাদের এই জ্ঞান কুরান-সুন্নাহর গন্ডিতে আবদ্ধ।”

ইসলামে তাসাউফের গুরুত্ব সম্পর্কে ফিকহের ইমাম মালেক রহ. বলেন- “যে ব্যক্তি শুধু ফিকহের ইলম শিখল, কিন্তু তাসাউফ হাসিল করলনা, সে ফাসিক। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি শুধু তাসাউফের ইলম শিখল, কিন্তু ফিকহের ইলম শিখল না, সে ধর্মদ্রোহী। আর যে ব্যক্তি উভয় বিষয়ের ইলম হাসিল করল সে যথার্থ কাজ করল।”

ইসলামী শরীয়তের মূখ্য উদ্দেশ্য হল-

প্রথমত, ইলমুল আকায়েদ, যার লক্ষ্য হল বিশুদ্ধ আকীদা/বিশ্বাস অর্জন করা এবং বিদাত ও শিরক বর্জন করা।

দ্বিতীয়ত, ইলমুল আখলাক, যা নফসকে অসৎকর্ম থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে প্রলুব্ধ করে।

তৃতীয়ত, ইলমুত তাসাউফ, যা মানব আত্মাকে (নফস) পবিত্র আত্মায় পরিনত করে।

চতুর্থত, ইলমুল ফিকহ, যা হল আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার এবং বান্দাদের পরষ্পরের মধ্যকার বিধিবিধানসমূহ।

মূলত তিন ধরনের আখলাক অর্জন/বর্জন করা এর মূল লক্ষ্য যার মাধ্যমে বান্দা তার বন্দেগীর শীর্ষে পৌঁছায়, আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়, প্রকৃত মুসলিমে রূপান্তরিত হয় এবং মানব আত্মা পবিত্র আত্মায় পরিনত হয়।

প্রথমত, আখলাকে হামীদা/সচ্চরিত্র যেমন- শোকর, সবর, খোদাভীতি, রিজা, যুহদ, তাকওয়া, অল্পেতুষ্টি, ইখলাস, খুশু ও খুজু ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, আখলাকে রাজিলা/অসচ্চরিত্র  যেমন- হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, পরনিন্দা, লোভ-লালসা, মিথ্যা বলা, কৃপণতা, লৌকিকতা, কপটতা, ধোঁকাবাজি, আত্মগরিমা, দুনিয়ার মুহাব্বাত ইত্যাদি।

তৃতীয়ত, আখলাকে হাসানা যা ক্বলবকে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ করার জন্য সুফি-সাধকগন নিজেদের মধ্যে আনার চেষ্টা করেন যেমন- তাওয়াক্কুল, তওবা, মুরাকাবা, মুহাসাবা, তাফাক্কুর, তাদাব্বুর ইত্যাদি।

আমলের স্পৃহা, শক্তি এবং কুরান-হাদিসের শিক্ষার আলোকে অন্তর পবিত্রকরণ – এসব বিষয় সাধারণত শুধু কিতাব দ্বারা হয়না, বরং এসব মহান উদ্দেশ্যের জন্যে আল্লাহওয়ালাদের সোহবত-সংশ্রব এবং তাদের কাছ থেকে হিম্মতের তরবিয়ত গ্রহন করার প্রয়োজন রয়েছে। এরই নাম তাযকিয়াহ বা আত্মশুদ্ধি। পরিভাষায় এরই অপর নাম তাসাউফ তথা পীর-মুরীদী। হক্কানী পীর-মুরীদী এছাড়া কিছুই নয়।

নফসের ইসলাহ ও সংশোধনের জন্য, তরবিয়তের জন্য একজন শাইখ বা মুরুব্বীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। একে পীর-মুরীদী বলা হোক বা অন্য কিছু, সেটা মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। সোহবত বা সান্নিধ্য লাভের প্রভাব স্বভাবের উপর অত্যন্ত কার্যকরী হয়। এটি অতি সুস্পষ্ট বিষয়। এজন্যে শরীয়তে নেককার এবং উলামায়ে কেরামের সংসর্গ অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সৎসঙ্গের উপমা হল মেশক বহনকারীর ন্যায়। যদি মেশক নাও পাও ঘ্রান তো অবশ্যই পাবে। অসৎ সঙ্গের উপমা হল হাপরধারীর ন্যায়। তার স্ফুলিঙ্গ না লাগলেও ধোয়া থেকে রেহাই পাবেনা” -সুনানে আবু দাউদ।”

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন- “তোমাদের সর্বোৎকৃষ্ট সঙ্গী সে, যাকে দেখলে আল্লাহ তায়ালার কথা স্মরন হয়, যার কথায় ইলম বৃদ্ধি পায়, যার কাজ-কর্ম তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরন করিয়ে দেয়”-আব্দ ইবনে হুমাইদ, আবু ইয়ালা ইতিহাফুল খিয়ারা।

তাসাউফ তথা আত্মশুদ্ধির চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয় নববী যুগেই, নবীজি সা. এর পবিত্র উপস্থিতিতে। খোলাফায়ে রাশেদীনের জমানায়ও এর চর্চা অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ তাবেয়ীদের জমানায় তা আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, নবী এবং সাহাবীদের জমানায় তাফসীর/মুফাসসির, হাদিস/মুহাদ্দিস, ফেকাহ/ইজতিহাদ/মুজতাহিদ সবই ছিল, কিন্তু এসবের আনুষ্ঠানিক রূপ প্রকাশিত হয় তাবেয়ী বা পরবর্তী জমানায়।

নবুয়তের যুগে সাহাবীদের তাসাউফ চর্চা হত নবীজি সা. কে কেন্দ্র করে। নবীজি সা. ছিলেন সাহাবীদের শায়খ/পীর/মুর্শিদ। নবীজি সা. এর পবিত্র সাহচর্য এবং দিক-নির্দেশনায় সাহাবীরা তাওহীদ, শরীয়ত, আখলাক, আত্মশুদ্ধি, জিহাদ, নামাজ, জিকির, তা’লিম, দাওয়াহ, শাসনব্যবস্থা, মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ইত্যাদি দ্বীনি বিষয়ের শিক্ষা ও দীক্ষা পেতেন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের জমানায়ও খলিফা এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের তত্ত্বাবধানে তাসাউফের চর্চা অব্যাহত ছিল। প্রসিদ্ধ সুফি আবু বকর আল ওয়াসেতি বলেন- “ইসলামী জগতে সর্বপ্রথম আবু বকর রা. থেকেই তাসাউফের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।” তাইত সুফিদের ধারায় সবাই আবু বকর এবং আলী রা. কেই নবীজি সা. এর পর ইমাম নিসবত করে থাকেন। সাহাবীরা নবীর সাহচর্য পেয়েছেন বলেই তাদেরকে সাহাবী উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যেমনিভাবে তাবেয়ীদের যুগে তাসাউফের চর্চা করার কারনেই সুফি উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইমাম আবু নুয়াইম আল ইস্পাহানী তাই তার প্রনীত “হিলয়াতুল আউলিয়া” গ্রন্থে সুফিদের মধ্যে সাহাবীদেরকেও শামিল করেছেন।

মূলত, প্রাক ইসলামী যুগে যখন মুসলিমগণ দিগ্বীজয়ী হয়ে উঠে এবং একের পর এক দেশ পদানত হতে থাকে, তখন মুসলিমদের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হয়ে উঠে। তখন অনেকেই বিলাসিতা, অপব্যয় ইত্যাদিতে মত্ত হয়ে উঠে। এই পরিস্থিতিতে সালফে সালেহীনের অনুসারীরা এর বিপরীতটি গ্রহন করেন। তারা দুনিয়ার চাকচিক্য ছেড়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে অনাড়ম্বর জীবন যাপন (যুহদ/দুনিয়া বিমুখতা) করতে শুরু করেন এবং দুনিয়ার ঐশ্বর্য থেকে বিমুখ মনোভাব পোষন করেন। যার ফলস্বরূপ হিজরী ২য় শতকে তাসাউফের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

আবার অনেকের মতে, রাশিদুন পরবর্তী খলিফারা যেহেতু উম্মতের আমলী দিকটাকে দেখভাল করা কমিয়ে দিয়েছিল (তারা ছিল খিলাফত বা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত) তাই আলী রা. এর জীবদ্দশায় উনার থেকে দীক্ষা নিয়ে ইমাম হাসান বসরী রহ. দ্বীনের প্রভাব মানুষের মাঝে টিকিয়ে রাখা এবং ব্যাপক করার জন্য কুরান-সুন্নাহের জ্ঞানের ভিত্তিতে দাওয়াত, তালিম এবং তাযকিয়াহর উপর আমলের (পরোক্ষভাবে ইসলামের উপর চলা, হালাল-হারাম, সুন্নাত-বিদাত ইত্যাদি মেনে চলা) একটি পদ্ধতি চালু করেন এবং খানকাহ (ফার্সি শব্দ খানঘা) প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই,আনুষ্ঠানিকভাবে তাবেয়ীদের জমানা থেকেই এই সিলসিলা চলে আসছে।

এরপর ইবরাহিম ইবনে আদহাম, ফুজায়েল বিন আয়াজ, মারুফ আল-কারখী, জুননুন মিশরী, জুনায়েদ বাগদাদী, সুফিয়ান সওরী, আব্দুল কাদির জিলানী, ইমাম গাজ্জালী, আব্দুল কাদির জিলানী, আহমদ সিরহিন্দ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহ. প্রমুখ শরীয়তের প্রাজ্ঞ আলিম বুজুর্গরা এটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে যুগে যুগে দাওয়াত, তালিম এবং আত্মশুদ্ধির কাজ চালিয়ে এসেছেন।

আমাদের উপমহাদেশে ১২শ শতাব্দীর দিকে এসেছিলেন খাজা মইনুদ্দীন চিশতী রহ.। ইতিহাসে উল্লেখ আছে উনার বয়ান শুনে তৎকালীন সময়ে প্রায় ১ কোটি মানুষ মুসলমান হয়েছিল। শুধু তাই নয়, উনার কারামত দেখেই পানিপথের প্রথম যুদ্ধের সময় রাজা পৃথ্বীরাজ এর সেনাবাহিনীর ৫০ হাজার হিন্দু সৈন্য মুসলিম হয়েছিল।

থমাস আর্নল্ড তার “The Preaching of Islam, A history of the propagation of the Muslim faith” গ্রন্থে বলেছেন- “কোন রাজকীয় ক্ষমতা ছাড়াই মুসলিম দাঈদের হাতে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছে মধ্য আফ্রিকা, চীন এবং ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে।” একই তথ্য সাইয়েদ নদভী রহ. তার আলী রাঃ এর জীবনী গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন।

যাই হোক দুনিয়াদার, বিলাসী এবং দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন মুসলিম শাসকদের ঐ সময়টায় পীর-মাশায়েখদের আত্মশুদ্ধি এবং দাওয়াহর কারনেই ইসলাম আজ আমাদের কাছে এসেছে।

শুধু সম্রাট আকবরের কথাই চিন্তা করা যাক যিনি এতটাই ইসলামবিমুখ ছিলেন যে হিন্দু ধর্মের একটা সংস্করণ হিসেবে আনলেন দ্বীন-ই-ইলাহী এবং নিজে হলেন নবী। ভারতবর্ষের সম্রাট হিসেবে এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। কিন্তু এর বিরুদ্ধে জিহাদে নামলেন শায়খ সিরহিন্দ রহ. যাকে তার অবদানের জন্য আমরা ঢাকি হিজরী ১ হাজার শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। অথচ উনি ছিলেন ঐ যুগের একজন প্রখ্যাত পীর এবং আলিম।

এভাবে শায়খ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, বালাকোটের সাইয়েদ আহমদ শহীদ, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী শাইখুল হিন্দ, আওলাদে রাসূল হোসাইন আহমদ মাদানী, দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা কাসিম নানুতুবী, শাহ আশরাফ আলী থানভী, তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস প্রমুখ সকল যুগের বিখ্যাত আলিমগন ছিলেন পীর।

সকলের উদ্দেশ্যই ছিল উম্মতকে গুনাহ থেকে বাঁচানো, সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান, দাওয়াত এবং প্রয়োজন হলে জিহাদে শরীক করানো।

প্রথম যুগের ইমাম আবু হানিফাসহ সকল ইমাম যে পীর ছিলেন তথা তাসাউফ এর সিলসিলায় যুক্ত ছিলেন তার প্রমানস্বরূপ “ফাজায়েলে আমাল” এর লেখক শায়খ জাকারিয়া রহ. “শরীয়ত আওর ত্বরীকত কা তালাযুম” নামে একটা বইও লিখেছেন।

ইসলামের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অনেক ব্যক্তিত্বই হয় পীর ছিলেন, নইলে পীরের মুরীদ ছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী রহ. এবং সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ. উভয়ই ছিলেন ঐ যুগের প্রখ্যাত পীরের মুরীদ।

ইদানিং অতি জ্ঞানী কিছু লোক একবিংশ শতাব্দীতে এসে জিজ্ঞেস করে এই পীরগিরি, পীরতন্ত্র (নাউজুবিল্লাহ, এটা মতবাদ বা তন্ত্র নয়, তাসাউফ চর্চা তথা শরীয়ত) ইসলামে কোথা থেকে আসল? অথচ কয়েক শতাব্দী কিংবা ৭-৮শ বছর আগে তাদেরই হিন্দু বা বৌদ্ধ পূর্বপুরুষ এই সমস্ত যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ, দাঈ এবং পীরদের হাতেই ইসলাম কবুল করেছে!!

যাই হোক, তাসাউফ এর ব্যাপারটা ক্লিয়ার করার জন্য সবচেয়ে ভাল হল মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক দাঃ বাঃ এর “তাসাউফ তত্ত্ব ও বিশ্লেষন”, প্রফেসর এবিএম সিদ্দিকুর রহমান রহ. এর “তাসাউফ তরীকতঃ উঠপত্তি ও ক্রমবিকাশ” এবং সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর বইগুলো পড়া। বিশেষ করে মুহাম্মাদ ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত “সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস” পড়লে অনেক কিছুই ক্লিয়ার হবে।

আল্লাহপাক আমাদেরকে ভবিষ্যতে এই রূহানী মাহফিলে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য নসীব করুক, আমিন।

1243Shares