| |

ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিঃ আদর্শিক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ

প্রকাশিতঃ ৬:০৬ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ০৭, ২০১৮

তারেক আদনান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিনদিন একটি বিষয় পানির মতই স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে যে, এদেশের দুর্নীতিগ্রস্থ, কলুষিত সেক্যুলার রাজনীতি এবং অনাদর্শিক ইসলামী রাজনীতির বিপরীতে দেশের কল্যাণকামী, সততা ও আদর্শিক ইসলামী রাজনীতির চর্চাকারী এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আন্দোলন পরিচালনাকারী দলের মধ্যে ইসলামী (শাসনতন্ত্র) আন্দোলন বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে, আলহামদুলিল্লাহ।

বাংলার শস্যভাণ্ডার খ্যাত বরিশালের সম্ভ্রান্ত সৈয়দ বংশের সন্তান মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম দা.বা. এর যোগ্য নেতৃত্বে ২০১৮ সালে এসে মনে হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশপ্রেম ও ইসলামী রাজনীতির ফিল্টারে উত্তীর্ণ হয়ে একটি নিজস্ব/স্বকীয় অবস্থান গড়ে তুলতে পেরেছে। আশা করছি, ইনশাল্লাহ আগামী দিনে দুই সেক্যুলার জোটের বিপরীতে ইসলাম ও দেশপ্রেমের ঝান্ডা উত্তোলন করে ইসলামী আন্দোলন তৃতীয় বা বিকল্প শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

খুব মনে পড়ছে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ ইসলামী রাজনীতির দিকপাল মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম রহ. এর ভবিষৎবাণী। ইন্তিকালের কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন- “আমার ইন্তিকালের পর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে।“ আলহামদুলিল্লাহ ইসলামী আন্দোলনের বর্তমান অবস্থান তিনি যে একজন খাঁটি আল্লাহর ওলী ও দূরদর্শী আমীর ছিলেন এটাই তার প্রমান।

তাছাড়া রাজনীতির ময়দানেও তিনি তার পরহেজগারিতা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। পর্দার বিধান লংঘনের ভয়ে তিনি কখনো ইউরোপ-আমেরিকা সফর করেননি যদিও তার অনুসারীরা তাকে বারবার দাওয়াত দিয়েছিলেন। এমনকি একবার বিএনপির পক্ষ থেকে খালেদার সাথে বৈঠকের কথা উঠলে হজরত আগ্রহ দেখাননি। তবে যদি প্রয়োজন হয় তখন তিনি শর্ত দিয়েছিলেন খালেদাকে পর্দা করে আসতে হবে।

 

ইতিহাস স্মরণে আসছে। ২০০১ সালে যখন আওয়ামীলীগের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের অধিকাংশ আবেগী উলামা এবং ইসলামী দলগুলো খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তখন ফজলুল করীম রহ. ঘোষণা করেছিলেন- ”নারী নেতৃত্ব ইসলামে হারাম, জাতির জন্য অভিশাপ।“

অনেক উলামা সেদিন বলেছিলেন ফজলুল করীম সাহেব রাজনীতি বুঝেন না। তিনি বলেছিলেন- ”নারী নেতৃত্বের জোটে যাইনি বলে আমাকে বলা হয় আমি নাকি রাজনীতি বুঝি না!! “ তার এই কথায় আমার ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর উক্তি মনে পড়ে।

পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল এবং মাদানী রহ. এর বিরোধীতা করেছিলেন, তখন অনেকে হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থনের কথা বলেছিলেন। এর জবাবে মাদানী রহ. দৃঢ়চিত্তে বলেছিলেন- “আমি (ময়দানের) রাজনীতিক, তিনি নন।”

আবার, দেশের ক্রান্তিকালে সেক্যুলার শক্তির সাথে জোটের প্রয়োজন হলে তার রূপরেখা কেমন হবে তার দিকনির্দেশনাও তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগমুহূর্তে এরশাদ সাহেব এসে যখন হজরতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন, তখন হজরত কতগুলো শর্ত দিলেন এবং অঙ্গীকার নিলেন।

শর্তগুলো হল- জোটের নাম হবে “ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট“ (যাতে ইসলামের প্রাধান্য স্পষ্ট), ইসলামী আন্দোলনের ৮ দফা দাবি মেনে নিতে হবে (যার প্রথমটিই ছিল দেশের বিদ্যমান সংবিধান ও আইনব্যবস্থা থেকে সকল ব্রিটিশ-সেক্যুলার-ইসলামবিরোধী আইন বাতিল এবং সর্বস্তরে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা), এরশাদকে অতীতের সকল অন্যায় কাজের জন্য তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে ইসলামসম্মত জীবনযাপন করতে হবে, জোটের চেয়ারম্যান থাকবেন হজরত নিজে এবং বেগম রওশন এরশাদ দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিলে পর্দা করে আসতে হবে।

বাংলাদেশের ইসলামী সাহিত্য অঙ্গণের অন্যতম কিংবদন্তী  মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর স্মৃতিচারণ করে একবার বলেছিলেন- “সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর রাজনৈতিক দর্শনে আমি ব্রিটিশবিরোধী সর্বপ্রথম সর্বভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ. (বালাকোটের অমর শহীদ) এর দর্শনের মিল খুঁজে পাই, যিনি একহাতে মানুষের থেকে তাসাউফের বায়াত নিতেন এবং অন্যহাতে মানুষের থেকে ব্রিটিশবিরোধী জিহাদের বায়াত নিতেন।“

২০০৮ সালেও যখন ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্থ ও ইসলামবিরোধীলীগ ও বিএনপির পক্ষেই এদেশের উলামারা অবস্থান নিলেন, তখন জাতীয় নির্বাচনে ”একলা চলো নীতি“ মেনে ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনে পিউর ইসলামী শক্তির জয়গান গাইতে অংশগ্রহণ করল এবং বৃহৎ দুটি শক্তির জোটবদ্ধ রাজনীতির কল্যাণে অনেক আসনে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হল।

২০১৪ সালে যখন সরকার একতরফা নির্বাচন দিয়ে জাতির ভোটের অধিকারের সাথে গাদ্দারী করল তখন ইসলামী আন্দোলন ঘোষণা দিল- ”যারা মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয় তাদের অধীনে নির্বাচনে যাবো না আমরা।”

উল্লেখ্য, যারা ইসলামী আন্দোলনকে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী একটি শক্তির সাথে বিরোধী দলে থেকেও লিঁয়াজো মেন্টেইন করার হাস্যকর এবং ভিত্তিহীন অপবাদ দেয় তাদের জন্য এই বয়কট ছিল একটি শিক্ষনীয় সবক (যদি তাদের অন্তর্চক্ষু বলে কিছু থাকে)।

২০১৩ সালে হেফাজতের উত্থানের পর ইসলামী আন্দোলন চেয়েছিল নবীজির ﷺ ভালবাসার উসিলায় (একটি অপূর্ব সুযোগ, যা সবসময় আসে না) দেশের সর্বস্তরের উলামাদের অংশগ্রহণে এবং বিদ্যমান ইসলামী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তিতে একটি একক বৃহত্তম ইসলামী শক্তি গড়ে উঠুক।

উল্লেখ্য, ইসলামী দলগুলো যদি রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তারা হবে বাংলাদেশের এক নাম্বার শক্তি। সেক্ষেত্রে তাদের প্রভাব রাজনীতি, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী সব জায়গায় পড়তে বাধ্য। তারা যদি ঐক্যবদ্ধ হত তাহলে বাংলাদেশের চেহারাই পালটে যেত।

ইসলামী আন্দোলন চেয়েছিল উলামা এবং ইসলামী দলগুলো যারা লীগ-বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ তারা বেরিয়ে আসুক লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি থেকে এবং ভবিষ্যতে তাদের যেকোন আন্দোলনের সুফল যাতে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে যায়, দেশপ্রেমিক জনতার স্বার্থে যায়, ভোটের সুফল যাতে ইসলামী শক্তির পক্ষে থাকে। কারন অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইসলামী আন্দোলন জানে যে অতীতের অনেক ইসলামী শক্তি ও মুসলিম জনতার ঘামঝরানো, রক্তপ্লাবিত আন্দোলন-সংগ্রামের সুফল সেক্যুলার ইসলামবিদ্বেষী শক্তি ঘরে তুলে নিয়েছে। এই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেই গ্যারান্টি তারা চেয়েছিল।

সেদিন হাটহাজারীর সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের সংগ্রামী আমীর সৈয়দ রেজাউল করীম বলেছিলেন- “স্বাধীনতার ৪৭ বছর আমরা উলামা ও ইসলামী শক্তি তাদের (সেক্যুলার-ইসলামবিদ্বেষী শক্তি) দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছি। আমাদেরকে ব্যবহার করে তারা বারবার ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। (রাগতস্বরে) আমরা আর তাদের কাছে যাবনা, তারাই আমাদের কাছে আসবে। আমরা ইসলামী শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে নাস্তিক-মুর্তাদরা বাংলার জমিনে পালাবার পথ পাবে না।“

বক্তব্যের শেষে দূরদর্শী আমীর সেদিন বলেছিলেন- ”সবাইকে সতর্ক থেকে সামনে পা বাড়াবার উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।…পরামর্শভিত্তিক সব কাজের সাথে আমরা আছি। বাকি আল্লাহ পাকের ইচ্ছা।“

এরপর কি হল?

নাস্তিক ইস্যুকে সামনে রেখে হেফাজত নেতৃত্বের মধ্যে ঘাপ্টি মেরে থাকা বিএনপিপন্থী ইসলামী দলগুলোর নেতৃবৃন্দ সাধারণ মুসলিমদের আবেগ ও রক্তকে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে কিছু এমপি-মন্ত্রীত্ব আদায়ের চেষ্টা চালালেন।

ফলশ্রুতিতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের রোষাণলে পড়লেন তারা। উল্লেখ্য, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিও একই আচরণ করত তাদের সাথে। আবেগে এবং নবীজীর ﷺ ভালবাসায় আগত শত শত মুসলিমকে (যারা রাজনীতির র ও বুঝতে চায়নি) রাতের আঁধারে শাপলায় ফেলে রেখে নেতারা পালিয়েছিলেন।

ক্ষমতার নেশায় বুঁদ একদল অপরিণামদর্শী এবং গাদ্দার নেতাদের ক্ষমতালোভের বলি হল শত শত মুসলিম। তখনকার একজন নেতা ত শুনেছিলাম আগেই টিকেট কেটে রেখেছিলেন ইংল্যান্ডে যাওয়ার। বাকিরা নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন রাতের প্রথম ভাগেই।

আমাদের উলামা ও ইসলামী শক্তির অদূরদর্শিতা এতটাই প্রকট যে আমাদেরকে সেদিন এমনভাবে, এমন স্লোগানে লংমার্চে আহবান করা হয়েছিল, এমনভাবে সরকার ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল যে, আমরা অনেকে ভেবেই ছিলাম বুঝি ইসলাম কায়েম হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে।

অথচ রাজনীতির র এর জ্ঞান যাদের আছে তারা সম্যক অবগত যে ক্ষমতা ও সেক্যুলার রাজনীতির ধারক বাহকরা কতটা নির্মম, ভয়ংকর এবং ইসলামবিদ্বেষী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির মত ইসলামবিরোধী দল তাদের আশ্বাস (একজন আবার রোজাও রাখতে বলেছিল) দিলেও তারা কিন্তু একজনও ঐ রাতে হেফাজতের সাথে ছিল না। এটাই সেক্যুলার শক্তির আসল রূপ।

আর, হেফাজতের নেতাদের দায়িত্বহীনতা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে শত শত আশেকে রাসূল মুসলিম সেদিন শহীদ হলেও কোন হেফাজত নেতা শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেননি। অথচ একজন নেতার প্রথম দায়িত্বই থাকে তার কর্মীর প্রতি। অবাক এবং আফসোস লাগে যে এরাই যদি ক্ষমতায় যেত এদের কাছে দেশের মানুষ ও মুসলিমরা কতটুকু নিরাপদ থাকত!

আজ যখন সেইদিনগুলোর কথা ভাবি তখন খুবই অবাক লাগে যে ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎবানীগুলো কেমন অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বর্তমান উলামাদের অবস্থান এতটাই নিচে নেমেছে যে আগে যারা বিএনপির লেজুড়বৃত্তি করে তাদেরকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য উদগ্রীব ছিল, তারাই এখন পুরো ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি শুরু করেছে এবং তাদেরকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সবক দিচ্ছে।

পরিশেষে বলব, অসংখ্য মৃত্যু, কুরবানী এবং শহীদানের রক্তের সাথে গাদ্দারী করে হেফাজত শুধু ইসলাম কায়েমের স্বপ্নে বিভোর এদেশের মুসলিমদের পথভ্রষ্ট ও হতাশই করেনি, বরং এদেশের উলামাদের মর্যাদাকে বরবাদ করে দিয়েছে এবং দেশের ইসলামী শক্তির স্পিরিটকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের কল্যাণে উলামারা এখন গাদ্দার ও মুনাফিক চরিত্রে ভূষিত হচ্ছে।

তবে আলহামদুলিল্লাহ, এদেশের কিছু মর্দে মুমিন মুসলমান (সত্যিকারের মুমিন ত সেই যে কখনো এক খাদে দুবার পড়েনা) এবং দূরদর্শী উলামা এখনো আছে যারা ক্ষমতার রাজনীতিকে দূরে ঠেলে নীতি-আদর্শের উপর অটল ও মজবুত থেকে প্রচলিত রাজনীতিতে দেশপ্রেম জাগ্রত করা ও আদর্শিক ইসলামী রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রেখেছে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারাই এখন বাংলাদেশের সর্বশেষ আস্থা-ভরসার প্লাটফর্ম। আল্লাহ পাক এই আন্দোলনকে পথভ্রষ্টতার হাত থেকে রক্ষা করুক এবং ক্ববুল করুক, আমিন।

 

তরুণ কলামিস্ট ও ইসলামী চিন্তক

0Shares